মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, নির্যাতন ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পূর্ণ হলেও নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবিতে রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের নবম বার্ষিকীতে কক্সবাজারের উখিয়ায় লাখো রোহিঙ্গা সমাবেশ করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার ৪ এক্সটেনশন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ফুটবল মাঠে নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) এ সমাবেশের আয়োজন করে। ‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সমাবেশে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির থেকে নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন বয়সের লাখো রোহিঙ্গা অংশ নেন।
মূল সমাবেশ সকাল ৯টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোর থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে মানুষ সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ও আশপাশের এলাকা মানুষে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত ও বাস্তুচ্যুত স্বজনদের স্মরণ করেন। একই সঙ্গে গণহত্যার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান তারা।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইউসিআরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। দুপুর ১২টার দিকে সমাবেশ শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে। তাই এ সংকটের চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ নয় বছর ধরে মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তারা।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘আমরা বিশ্বের কাছে মাত্র ১০ মিনিট সময় চাই, অথচ আমরা নয়টি বছর পার করে দিয়েছি। বাংলাদেশ আমাদের দেশ নয়, আমরা আমাদের নিজ দেশে ফিরতে চাই। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আরাকান আমাদের—এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। মানবিক বিশ্বকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’
ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য ও রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক সহায়তা করেছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ কোনো শরণার্থীশিবিরে নয়; আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে। আমরা সেখানে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো নয়, প্রত্যাবাসনের পর আমাদের নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।’
সমাবেশে প্রায় ৮০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা আব্দুল হাকিম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ‘দেখতে দেখতে নয় বছর চলে গেল। কিন্তু নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি। আমরা জানি না, কবে আবার মিয়ানমারের রাখাইনে নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারব। শরণার্থী হিসেবে আর কতদিন থাকতে হবে, সেটিও জানি না। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজের দেশে ফিরে যাওয়া।’

সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ইউসিআর নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সোয়াইব। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা ভয় বা অনিশ্চয়তা ছাড়াই নিজ দেশে ফিরতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নয় বছরেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা নেতা খিন মং বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি ত্রাণনির্ভর সংকটে পরিণত করা কোনো সমাধান নয়। আমরা সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শরণার্থী হিসেবে থাকতে চাই না। নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।’
ইউসিআরের নারী নেত্রী সাজিদা বেগম বলেন, ‘গণহত্যা ও নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব নারী ও শিশুদের ওপর পড়েছে। অসংখ্য মানুষ স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে আমাদের সন্তানদের আর পালিয়ে বেড়াতে হবে না। রোহিঙ্গা নারীদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
মাস্টার কামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ একা অনির্দিষ্টকাল ধরে এত বড় সংকটের দায়িত্ব বহন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু অর্থায়ন নয়, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপও বাড়াতে হবে।’
তার ভাষ্য, ‘সময় এসেছে শুধু সংকট ব্যবস্থাপনার নয়, স্থায়ী সমাধানের পথে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথরেখা তৈরি করতে হবে।’
সমাবেশের একপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা ১০ মিনিট ধরে রোহিঙ্গা ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর মধ্যে ছিল—‘শেষ হতা এক্কান ফিরতাম চাই আরকান’, যার অর্থ ‘আমাদের শেষ কথা একটাই, আরাকানে ফিরতে চাই’। এমন সব স্লোগানের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

বক্তারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকটে মানবিক সহায়তার অর্থায়নও ক্রমেই চাপে পড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের উপযোগী করে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষায় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারাা
সমাবেশ শেষে লাখো রোহিঙ্গাকে নিয়ে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মৌলভী আব্দুর রহিম। এতে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের শিকার মানুষের আত্মার মাগফিরাত, গণহত্যার ন্যায়বিচার এবং নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পথ সুগম হওয়ার জন্য প্রার্থনা করা হয়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এপিবিএনের সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।
সমাবেশ থেকে রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সংহতি ও কার্যকর কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের একটাই দাবি—নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন।


