একসময় বর্ষায় থইথই করত পানি। চলত ট্রলার, বড় বড় নৌকা। নদীজুড়ে ছিল স্রোত, জেলেদের জালে উঠত নানা প্রজাতির মাছ। অথচ ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখননের কয়েক বছর পরও বর্ষার শুরুতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাজীখালী নদী।
নদীর অধিকাংশ অংশজুড়ে এখন কচুরিপানার দখল, কোথাও কোথাও জমে থাকা বৃষ্টির পানি ছাড়া নেই স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে নদী পুনঃখনন প্রকল্পের কার্যকারিতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
সাটুরিয়া উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুকের ওপর দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘গাঙ কাটার পর থিকা পানি আহে না। আগে ট্রলার চলত, বড় বড় নৌকা চলত। নদী ভইরা যাইত পানিতে। অনেক মাছ ধরছি। কিন্তু খননের পরও নদীর কোনো উন্নতি হইল না।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, গোপালপুর থেকে সাটুরিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথের অধিকাংশ অংশ শুকিয়ে গেছে। সাটুরিয়া থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া পর্যন্তও একই চিত্র। কোথাও সামান্য পানি থাকলেও তা ঘন কচুরিপানায় ঢেকে রয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ।
গাজীখালী নদীর উৎপত্তি মানিকগঞ্জের গোপালপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে। পরে এটি ধামরাই হয়ে বংশী নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময় বর্ষা মৌসুমে ধলেশ্বরীর পানি প্রবাহিত হয়ে নদীটি প্রাণ ফিরে পেত। সেই পানির ওপর নির্ভর করেই চলত কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং হাজারো মানুষের জীবিকা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শত বছরেরও বেশি আগে গাজীখালী নদীকে ঘিরেই গড়ে ওঠে সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা নৌপথে এ বাজারে আসতেন। কিন্তু দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় নদীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীখালী নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাটুরিয়া, সিংগাইর, ধামরাই ও মানিকগঞ্জ সদর অংশ মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সাটুরিয়া অংশেই দুই দফায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।
প্রকল্প অনুযায়ী নদী দুই মিটার গভীর এবং তলদেশে ২৬ মিটার ও ওপরের অংশে স্থানভেদে ৫০ থেকে ৬০ মিটার প্রশস্ত করার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হয়নি। খননের নামে অনিয়ম হয়েছে, এ কারণে নদীর নাব্যতা ফেরেনি।
দরগ্রাম এলাকার জেলে জ্যোতিন রাজবংশী বলেন, ‘আগে নদীতে পানি থাকত, মাছও ছিল প্রচুর। শত শত জেলে এই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাইত। এখন পানি নাই, মাছও নাই। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছে।’
শেখরীনগর গ্রামের জাকির হোসেন বলেন, ‘বর্ষা এলেই নতুন পানিতে নদী ভরে যেত। শুশুকও দেখা যেত। এখন নদী খনন করে শুধু মাটি বিক্রি হয়েছে, নদীর কোনো উপকার হয়নি।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি যোগদানের আগেই পুনঃখননের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে নদীতে পানি না আসার প্রধান কারণ ধলেশ্বরী নদীর গোপালপুর এলাকার উৎসমুখ যমুনার পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া। উৎসমুখ পুনঃখনন করা গেলে আবারও পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’


