বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের উৎপাদন ব্যাপক, কিন্তু মানুষ ভোগ করতে পারে তার কেবল অর্ধেক। পরিসংখ্যান বলছে, ৪৫ শতাংশ কাঁঠালই নষ্ট হয়ে যায়। একই ঘটনা ঘটে আম, আনারস, পেয়ারাসহ অন্যান্য অনেক ফলের ক্ষেত্রে।
দেশে ফল সংরক্ষণে আধুনিক ও মানসম্মত ব্যবস্থাপনা যেমন নেই, ফল শুকিয়ে বা জুস আকারে অথবা অন্য কোনো উপায়ে বাজারজাত করার সুযোগও সীমিত। এ কারণে বাড়তি ফলন উৎপাদনের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত ফল আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
কেবল আম-কাঁঠাল নয়, আনারস, কলা, পেয়ারা ছাড়াও গত দুই দশকে তরমুজ, ড্রাগনসহ বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি ফলের আবাদ বেড়েছে। কিন্তু কৃষিভিত্তিক শিল্প বা ফল ব্যবস্থাপনার বড় উদ্যোগ নেই।
আমের আচার ও জুস তৈরির উদ্যোগসীমিত, কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরির চেষ্টা একেবারেই নতুন। অন্য ফলের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে জ্যাম ও জেলি বানানো হয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক গোলাম রব্বানী মনে করেন, ফলের সম্ভাবনা হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘যদি ড্রাই ম্যাঙ্গো, কাঁঠালের চিপস, জুস, পাল্প, ফ্রোজেন পণ্য ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত খাদ্যে রূপান্তর করা যেত, তাহলে একদিকে অপচয় কমত, অন্যদিকে আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমত।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান হাসনাত মোহাম্মাদ সোলায়মান বলেন, দেশে উৎপাদিত ফলের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সংগ্রহ-উত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয় কমানো গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বহুগুণে বাড়বে।
আমের বাড়তি উৎপাদনে কৃষকের ক্ষতি
আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম বলেন, দেশে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন আম উৎপাদিত হচ্ছে।
গত ১০ বছরে আমের উৎপাদন উত্তরোত্তর বেড়েছে, কিন্তু কৃষক পর্যায়ে দাম কমে গেছে। বাড়তি উৎপাদন চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। আর মৌসুমে একটি সংক্ষিপ্ত সময়ে ফল বাজারে আনতে হয়। তখন দাম পড়ে যায়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘শূন্য খাদ্য অপচয়ের পথে’ ও অর্থনীতির গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির একটি যৌথ প্রতিবেদন বলছে, প্রতি বছর ২৯ শতাংশ আম নষ্ট হয়।
প্রাণ, বিডি ফুডসহ বেশ কিছু কোম্পানি আমের আচার, জুস ও ম্যাঙ্গো বার নামে আমসত্ত্ব বানিয়ে বাজারজাত করে। তবে এটি চাষিদের বাড়তি উৎপাদন ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
অবশ্য শুকনো আমের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলায় ব্যক্তি পর্যায়ে একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা শেষে চলতি বছরই তিন বন্ধু–মাইনুল ইসলাম, আকুয়ানুল বান্না মাসুম ও মিঠুন আলী–খুলেছেন ‘সবুজ বাজার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
মাইনুল ইন্টারনেটে ভিডিও দেখে নিজেই এক বন্ধুর সহায়তায় একটি যন্ত্র বানিয়েছেন। এতে তার খরচ হয়েছে লাখ দেড়েক টাকা, তবে কাজ শেষ করতে আরও লাখ দেড়েক টাকা খরচ হতে পারে।
টাইমসকে মাইনুল জানান, প্রতি দিন তার মেশিনে ৫ কেজি শুকনো আম উৎপন্ন হচ্ছে। জাত ভেদে ১৫ থেকে ২০ কেজি আম থেকে দেড় কেজি শুকনো আম পাচ্ছেন, যা বৈয়ামে ভরে ফ্রিজে সারা বছর রেখে দেওয়া সম্ভব। এই শুকনো আম জাত ভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হয় দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।
এখন আম শুকানো হলেও অন্য মৌসুমে অন্য ধরনের ফল নিয়ে কাজ করার ইচ্ছাও আছে তাদের।
মৌসুমে যেখানে উৎপাদন স্থলে এক হাজার টাকা বা তার চেয়ে কমে এক মণ আম পাওয়া যায়, সেখানে এভাবে শুকিয়ে বিক্রি করলে যে বেশ ভালো মুনাফা হয়, সেটি মাইনুলের বক্তব্যেই স্পষ্ট।
দেশে আম চাষিদের ভরসা হতে পারত বিদেশের বাজার। তবে এখানেও আছে হতাশা।
সারা বিশ্বে আমের বিশাল রপ্তানি বাজার থাকলেও ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ৩৭টি দেশে ৩ হাজার ১০০ টন রপ্তানি করতে পারে। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৯৪ টনে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের রপ্তানি অধিশাখার কর্মকর্তা মফিদুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘সরকার নতুন বাজার খোলার চেষ্টা করছে। চলতি বছর মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি আম রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া কাঁচা আমের পাশাপাশি আমের জুস, আচার এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিরও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।’
কাঁঠালের বিপুল অপচয়
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।
দুই কৃষিবিদ মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী ও মো. হাফিজুল হক খানের এক প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, কাঁচা কাঁঠালকে ‘ভেজিটেবল মিট’ এবং পাকা কাঁঠালকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কাঁঠালের ছয়টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। আগাম, অসময়, বারোমাসি জাত সারা বছর সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়ক হতে পারে।
গাজীপুরের কাঁঠাল এরই মধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি ঢাকার ফলমেলায় কাঁঠালের বিরিয়ানি, বার্গার, রুটি, নকশি পিঠা, জালি কাবাব, কাঠি কাবাব, ললিপপ, চিপস, শিঙাড়া, সমুচা, পাকোড়া, চিপস, সাশলিক, পাটিসাপটা পিঠা, কাটলেট, কাপ কেক ও পেস্ট্রি প্রদর্শন করা হয়েছে।
এই ফলের বৈশ্বিক বাজার বিশাল। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কেট ইন্টেলো বলছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কাঁঠাল বাজারের আকার প্রায় ৩২০ কোটি ডলার। ইউরোপের নানা দেশেও কাঁঠালকে মাংসের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে চীন কাঁঠাল আমদানিরও আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে উৎপাদনই যে শেষ কথা নয়, সেটি পরিসংখ্যানেই দেখা যায়। বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে ভারত শীর্ষে থাকলেও রপ্তানিতে শীর্ষে ভিয়েতনাম।
থাইল্যান্ড প্রতিবছর ৭৬০ মিলিয়ন ডলারের কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানি করে। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরির কারণে থাইল্যান্ড মূল্য সংযোজন করতে পেরেছে।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ: কাঁঠাল’ অনুযায়ী, বিশ্বে কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা কেবল শূন্য দশমিক তিন শতাংশ। আবার বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির ৭৬ শতাংশই যায় শুধু যুক্তরাজ্যে।
হতাশার আরেক নাম আনারস
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) ২০২৪ সালের কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৩২ হাজার ৩৫৯ একর জমিতে ২ লাখ ৮ হাজার ৮২৭ টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে।
তবে আনারস দিয়ে জ্যাম ও জ্যালি বানানোর অল্প কিছু উদ্যোগ আছে। বাকি আনারস মূলত কেটে বিক্রি করা হয় এবং এর একটি বড় অংশই অপচয় হয়।
বাংলাদেশের ফল নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সমর বিশ্বাসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে উৎপাদিত আনারসের ৪৬ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। অন্যান্য ফলের তুলনায় আনারসের অপচয় সবচেয়ে বেশি।
তার গবেষণা অনুযায়ী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ উৎপাদন নষ্ট হয় পেয়ারা। আর এই অপচয়ের বেশিরভাগই ঘটে ফল বাজারে আনার পর।
এই গবেষণা বলছে, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে ফলের অপচয়ের হার বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় অনেক কম।
আহমেদ ফুডস নামে একটি কোম্পানি বহু বছর ধরেই জ্যাম-জেলি বাজারজাত করে আসছে। কোম্পানিটির একজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘ড্রাই ফ্রুটসের ধারণা বাংলাদেশে নতুন। এ বিষয়ে আমরা এখনো কিছু ভাবছি না।’
ফলের আমদানি কত
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, দেশে বিপুল পরিমাণ আম ও কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও শুকনো আমসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত ফল আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
ড্রাই ফ্রুট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচএম কার্গো ইমপোর্টার্স জানায়, বাংলাদেশ মূলত থাইল্যান্ড থেকে শুকনো আম, কাঁঠাল, আনারসসহ নানা ফল এবং কিছু পরিমাণ ড্রাই মাশরুম আমদানি করে থাকে।ভিয়েতনাম, চীন, ভারত, তুরস্ক ও ইরান থেকেও আসে অনেক ফল।
প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রতিনিধি বলেন, বাংলাদেশে ড্রাই ফ্রুটস প্রসেসিং শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক সহায়তা, উদ্যোক্তাদের মানসিক প্রস্তুতি এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।
এই আমদানিকারকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটির একটি করে শিপমেন্ট বাংলাদেশে আসে। সাধারণত প্রতি চালানে ৫০ থেকে ৬০ কেজি ড্রাই ফ্রুটস আসে, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তিনি জানান, স্থানীয় বাজারে যখন আম, কাঁঠাল ও আনারসের মৌসুম থাকে, তখন বিদেশি ড্রাই ফ্রুটসের চাহিদা ও বিক্রি উভয়ই কমে যায়।
বিবিএস-এর ২০২৫ সালের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই বছর ৯ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার তাজা ও শুকনো ফল এবং বাদাম আমদানি হয়েছে।


