ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মডেলেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের শাসন আমল চলছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস, দেশবিরোধী চুক্তি বাস্তবায়ন—ইত্যাদি আগের মতোই চলছে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূতিতে টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এ কথা বলেন।
‘৩৬ জুলাই’ খ্যাত এ আন্দোলন ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থান কি না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী কায়দায় পুলিশ, ছাত্রলীগ ও অপরাপর শক্তি দিয়ে নৃসংশভাবে দমনের চেষ্টা করে। কিন্তু এক পর্যায়ে জনতা ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাস্তায় নেমে আসলে এটি ‘এক দফার’ আন্দোলনে পরিণত হয়।’
‘সরকার সারাদেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নির্বিচারে খুন, দমন-নিপীড়ন, ধরপাকড় অব্যহত রাখে। এরপরেও সম্মিলিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকার সদলবলে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়,’ যোগ করেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থান নয়। আসলে স্বৈরাচারি হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঘনীভূত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সর্বোচ্চ বিস্ফোরণ এই অভ্যুত্থান।’
তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের মেয়াদ উত্তীর্ণ সরকার যখন প্রহসনের নির্বাচনে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় স্বৈরাচারি শাসন কায়েম করে, তখন থেকেই জনগণের মধ্যে এ সরকার বিরোধী মনোভাব গড়ে ওঠে। তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, “মেগা প্রকল্পে মেগা বাণিজ্য”, বিদেশে অর্থ পাচার চরমে পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তারা যেন দেশের মালিক, হাসিনা সরকার এমন মনোভাব থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে মিথ্যাচারের পাশাপাশি পুলিশ-র্যাব-ছাত্রলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগ ব্যবহার করে, ডিজিটাল আইনসহ অপরাপর কালো আইনে খুন, জখম, জেল-জুলুমের জোর-জবরদস্তির শাসন কায়েম করেছিল। তাদের লুটপাট-অত্যাচার তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়েছিল।’

‘এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র বাতিলের, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির আন্দোলন, পেশাজীবীদের আন্দোলন ও সবশেষ কোটা বিরোধী আন্দোলন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্ভব হয়েছে কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে “এক দফার আন্দোলনে” সাফল্য এসেছে।’
ক্ষমতাসীন ইউনূস সরকারের সাফল্যের প্রশ্নে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণ এখন স্বৈরাচার মুক্ত আবহে ভয়-ভীতি মুক্তভাবে বাস করতে পারছেন। জুলাই অভ্যুত্থানে আকাঙ্খাকে ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব দেশকে গণতান্ত্রিক পথ দেখাতে সহায়তা করছে। এ সবই সরকারের সাফল্য।’
‘অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, দেশবিরোধী চুক্তি বাস্তবায়ন—ইত্যাদি শেখ হাসিনার সরকারের মতোই চলছে। আগের মতো “মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি” না হলেও বিভিন্ন খাতে আবারো ফিরে আসছে সিন্ডিকেট,’ উল্লেখ করেন তিনি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট বৈষম্যবিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা হলেও দেখা যাচ্ছে লিঙ্গ, জাতি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকারের প্রশ্নে নারী, আদিবাসী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বার বার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে উগ্র বৈষম্যবাদী ও নারী বিদ্বেষীরা হামলা করে প্রগতিবাদী শক্তিকে দমন করতে চাইছে। এই অপশক্তিকে দমনে সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।’
দেশবিরোধী চুক্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ চুক্তিগুলো হাসিনা সরকারের আমলে করা হলেও জাতীয় স্বার্থবিরোধী এসব চুক্তি ইউনূস সরকার বাতিল করেনি। বরং তা বাস্তবায়ন করে চলেছে। আবার তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি চুক্তিসহ অনেক প্রকল্প দরপত্র ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
উদাহরণ টেনে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত “ঝুঁকিপূর্ণ” ও “জাতীয় স্বার্থবিরোধী”। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের আগ্রহ আমরা বুঝতাম। কিন্তু এখন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের একই আগ্রহ কেন?’
স্টারলিংকের সঙ্গে সরকারের চুক্তি প্রসঙ্গেও একই অভিমত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব চুক্তি যদি জনকল্যাণমূলক হয়, তবে তা গোপন না রেখে জনগণের সামনে উপস্থাপন করাই সরকারের দায়িত্ব।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘এছাড়া “মব ভায়লেন্স” করে “কাউকে উঠানো” বা “কাউকে নামানোর” যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা দমনে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। এছাড়া মাজার থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনা ও শিল্প-সংস্কৃতি ধ্বংসের “মব কালচার” দমনের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে সরকারকে নমনীয় দেখা গেছে।’
‘এর বিপরীতে প্রগতিবাদী, বৈষম্যবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনের শক্তিগুলোকে আরো বেশি করে সংগঠিত ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে,’ উপসংহার টানেন আনু মুহাম্মদ।


