সৈয়দ নজরুল স্কুলের নামবদল: কিশোরগঞ্জে তীব্র ক্ষোভ

সৈয়দ নজরুল স্কুলের নামবদল: কিশোরগঞ্জে তীব্র ক্ষোভ
Advertisement
Advertisement

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জে জন্মভিটা যশোদলে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয় থেকে গোপনে সৈয়দ নজরুলের নাম বাদ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। রাতের আঁধারে বিদ্যালয়ের ফটক থেকে মুছে ফেলা হয়েছে সৈয়দ নজরুলের নাম।

এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন একে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় নেতার প্রতি চরম অবমাননা ও ইতিহাস বিকৃতির শামিল বলে আখ্যা দিয়েছেন।

জানা গেছে, ১৯৭২ সালে কিশোরগঞ্জ সদরের যশোদল ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয় “সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়”। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নামেই পরিচিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি পরিপত্রের ভিত্তিতে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে “যশোদল মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” করা হয়।

বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন থাকলেও সম্প্রতি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনের নোটিশ থেকে প্রকাশ্যে আসে নাম পরিবর্তনের ঘটনা।

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মোর্শেদ আলী রোমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণত স্থানীয়দের দাবিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়। কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন, এমনকি স্কুলের মূল ফটকের পুরোনো নামটিও তারা মুছতে দিচ্ছিলেন না। অবশেষে রাতের আঁধারে নামটি সরানো হয়েছে, যা এলাকাবাসীর হৃদয়ে চরম আঘাত দিয়েছে।

আরেক সাবেক শিক্ষার্থী সাজিন আহমেদ তুষার বলেন, গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাম পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এলাকাবাসী তা জানত না। হঠাৎ একদিন রাতারাতি সাইনবোর্ড বদলে ফেলা হয়। সরকারি কাজ কেন গভীর রাতে চোরের মতো করতে হবে, সেই প্রশ্ন এখন সবার মনে।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা থাকলেও, জাতীয় নেতা হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামের নাম মুছে ফেলার এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে স্থানীয় বাসিন্দারা মেনে নিতে পারছেন না।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি ইসরাইল মিয়া তার ফেসবুক পোস্টে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও জাতির গর্ব। তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপ্রয়োজনীয়।

বিএনপির এই নেতা আরও লেখেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু জাতীয় ইতিহাসে অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা সবার দায়িত্ব। তিনি প্রতিহিংসা পরিহার করে সৌহার্দ্যের রাজনীতি চর্চা এবং দ্রুত আগের নাম বহাল রাখার আহ্বান জানান।

একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অভি চৌধুরী। তিনি এই ঘটনাকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের ‘কলঙ্ক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দায়ী করা কিংবা তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এমন কোনো কর্মকাণ্ডের নজির নেই, যা জাতির কাছে অসম্মানের। যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদ কিশোরগঞ্জ শাখার সভাপতি হারুন আল রশীদ এই সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এই নাম পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী মানুষদের স্মৃতি মুছে ফেলার অপচেষ্টা। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশকে যারা হৃদয়ে ধারণ করেন, তারা এমন সিদ্ধান্ত কখনোই সমর্থন করতে পারেন না। তিনি অবিলম্বে এই প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানান।

এর আগে কিশোরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইফ উদ্দীন আহমেদ লেনিন ফেসবুকে লেখেন, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম শুধু একটি নাম নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মহান এই নেতার নামে তাঁর বাড়ির পাশেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত, অথচ এই নামটি পরিবর্তন করা হলো। এই পবিত্র নামকে এত ভয় কিসের?

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর ১৫ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন) ভূপেশ রঞ্জন রায় স্বাক্ষরিত “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ ও বিদ্যমান নাম পরিবর্তন নীতিমালা-২০২৩” অনুযায়ী দেশের ২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই তালিকায় কিশোরগঞ্জের এই বিদ্যালয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয়দের আপত্তির কারণে মূল ফটকের নাম পরিবর্তনে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় এখনও উত্তেজনা ও সমালোচনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এলাকাবাসী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির দাবি, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের গৌরব। অনতিবিলম্বে এই বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন বাতিল করে বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবময় নামটি পুনর্বহাল করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে কিশোরগঞ্জবাসী।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad