অনলাইনে প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মতো সাইবার অপরাধের তদন্তে সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রামে চালু হয়েছে সাইবার পুলিশ সেন্টার।
৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত এই কেন্দ্রের মাধ্যমে ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাইবার অপরাধের ধরন ও পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অপরাধের তদন্তও জটিল হয়ে উঠছে। অপরাধীরা ভুয়া পরিচয়, একাধিক ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক হিসাব এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী এক দেশে অবস্থান করে অন্য দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ডিজিটাল আলামত বিভিন্ন সার্ভারে ছড়িয়ে থাকা কিংবা মুছে ফেলার কারণে অপরাধী শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বুধবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের দামপাড়ায় মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে সাইবার পুলিশ সেন্টার, চট্টগ্রামের উদ্বোধন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন, কইকার কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহন কিম পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন ও সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান বিশ্বে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে অপরাধের ধরন পাল্টেছে। অনলাইনে স্ক্যাম ও শেয়ার বাজার ম্যানিপুলেশনের মতো আধুনিক অপরাধ প্রতিরোধে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে দেশের ৮টি বিভাগীয় সদর দপ্তরে দ্রুতই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হবে এবং কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এই সক্ষমতা সম্প্রসারণ করা হবে। বিচার ব্যবস্থায় দ্রুত বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সিআইডির ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
‘সেইফার সাইবারস্পেস ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ: এনহ্যান্সিং ন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ক্যাপাবিলিটি অব বাংলাদেশ পুলিশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সাইবার পুলিশ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কইকা) সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। একই বছরের ১৫ মে জারি করা হয় প্রশাসনিক আদেশ। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় ১০ তলা ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি সিআইডি সদর দপ্তরে তদন্ত কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে সাইবার পুলিশ সেন্টার ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় তিনটি স্থানীয় ও আটটি বৈদেশিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার ধরনও বদলেছে। ফিশিং লিংক, ভুয়া ওয়েবসাইট, পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক বার্তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটছে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশের মতো অপরাধও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এসব অপরাধের তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, অনলাইন যোগাযোগের তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে অপরাধের সূত্র শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের তদন্তের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়।
সাইবার অপরাধের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অপরাধী, ভুক্তভোগী এবং অপরাধে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করতে পারে। অপরাধের অর্থ একাধিক ডিজিটাল হিসাব ঘুরে অন্যত্র চলে যেতে পারে। আবার গুরুত্বপূর্ণ আলামত বিদেশি সার্ভারে সংরক্ষিত থাকায় সেগুলো সংগ্রহ করতেও সময় ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
ডার্ক ওয়েবের অপব্যবহার, চুরি করা তথ্যের লেনদেন, অনলাইন মাধ্যমে অবৈধ পণ্য কেনাবেচা এবং ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের তদন্তেও বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়।
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কইকার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


