ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিছুতেই বিদেশে না পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। ইরানি কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মোজতবা খামেনির এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ঘিরে ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হলো। শুধু তাই নয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে না পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্টের অন্যতম প্রধান দাবিও প্রত্যাখ্যান করলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের দুই সূত্রের একজন বলেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান একমত হয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশের বাইরে নেওয়া যাবে না।’
সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে দেশটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। আইন অনুযায়ী, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কেবল সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির হাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্দেশনা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরও ক্ষুব্ধ করতে পারে এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা জটিল করে তুলতে পারে।
এর আগে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রাখতে দেবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেটা (অস্ত্র তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) নিয়ে নেব। আমাদের এটার প্রয়োজন নেই, চাইও না। সেগুলো পাওয়ার পর সম্ভবত ধ্বংস করে ফেলব। কিন্তু তাদের কাছে এটা থাকতে দেব না।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং তিনি কেবল এমন চুক্তিই করবেন, যা মার্কিন জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।’
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাদের আশ্বস্ত করেছেন- ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত শিগগিরই দেশটির বাইরে পাঠানো হবে এবং যেকোনো শান্তি চুক্তি করতে হলে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারা থাকতে হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, তেহরানের ‘প্রক্সি মিলিশিয়াদের’ (ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস) প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে মনে করবেন না।
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি এবং অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এর জেরেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘নড়বড়ে’ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও শান্তি প্রচেষ্টায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ সূত্রের মতে, তেহরান সন্দেহ করছে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত ওয়াশিংটনের ‘কৌশলগত প্রতারণা’। ইরানিদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে পরে আবার হামলা চালানোর কথা ভাবছে তারা।
ইরানের প্রধান শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার বলেন, ‘শত্রুর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা’ প্রমাণ করে- যুক্তরাষ্ট্র নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ট্রাম্পও বুধবার বলেছেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে সম্মত না হলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আরও হামলা চালানো হতে পারে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের পক্ষ থেকে ‘সঠিক উত্তর’ পাওয়ার জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করা হতে পারে।

ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভবিষ্যতে দেশটিতে আর হামলা চালাবে না- এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা পাওয়া।
তাদের মতে, কেবল এ ধরনের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে প্রস্তুত হবে, তার আগে নয়।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের অর্ধেক বিদেশে পাঠাতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের ধারাবাহিক হামলার হুমকির পর তেহরান সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর সময় ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এর কতটুকু এখনো অক্ষত আছে, তা স্পষ্ট নয়।
সংস্থাটির প্রধান রাফায়েল গ্রোসি মার্চে বলেন, অবশিষ্ট মজুতের বড় অংশ ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংস্থাটির বিশ্বাস, সেখানে ২০০ কেজির কিছু বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এছাড়া নাতাঞ্জের বৃহৎ পারমাণবিক কমপ্লেক্সেও কিছু মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সেখানে ইরানের দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে।
ইরানের দাবি, চিকিৎসা খাত এবং তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লির জন্য কিছু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন রয়েছে। ওই চুল্লিটি তুলনামূলক কম পরিমাণে প্রায় ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হলেও দেশটি কখনো এ বিষয়ে স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। কয়েক দশক ধরে তারা এ বিষয়ে অস্পষ্ট নীতি বজায় রেখেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হামলার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না এবং ইসরায়েলকে আবার অভিযান শুরু করার অনুমতি দেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।


