মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান।
তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সংঘাত সত্ত্বেও আগের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ও সমর্থন জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কূটনৈতিক, আইনি ও মানবিক সব উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
এর আগে সোমবার বিকাল সাড়ে তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
বিএনপি ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে দুই দফায় সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা তথ্য যাচাইকরণ করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার হতে ৬টি ধাপে আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তিন লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের (জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকার মধ্যে মিয়ানমার সরকার দুই লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন প্রদান করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা অপরাধ সংগঠনের দায়ে একটি মামলা নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারাধীন রয়েছে।
গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমারের মামলাটি পরিচালনায় বাংলাদেশ আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ এই আইনি প্রক্রিয়াকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগসমূহকে সমর্থন করছে।
জামালপুর-২ আসনের সুলতান মাহমুদ বাবুর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে দেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি তথা কূটনীতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইউরোপ, আমেরিকার মত প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি দেশি পণ্যের নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানে সরকার কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে।
সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (পিটিএ) এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আমাদের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও জোরদার হবে।
রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের তৈরি পোশাক খাতের এককেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য সমৃদ্ধ বহুমাত্রিক রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বর্তমান সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন দূতাবাস ‘ডায়াসপোরা এনগেজমেন্ট’ কার্যক্রম জোরদার করেছে। রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রক্রিয়া বেগবান করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নোয়াখালী-৫ আসনের মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন হলো জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা করা।
দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে আমরা পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সিসিসিভুক্ত দেশসমূহ এবং ইরান উভয় পক্ষেই যে বাংলাদেশকে একটি বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করছে তা আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রাথমিক ফলাফল, যোগ করেন তিনি।
জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, জ্বালানির কোনো সংকট বাংলাদেশে নেই। একাধিক উৎস হতে জ্বালানি আমদানি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। আমরা যাতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বিকল্প উৎস হতে জ্বালানি আমদানি করতে পারি সে জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।


