পরিচালনগত অদক্ষতা, রাজস্ব ফাঁকি এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের মুখে রেলের আয় বাড়াতে নতুন বিজ্ঞাপন নীতিমালা চালু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রী ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের বাইরে আয়ের উৎস বাড়াতে এবং পুরো রেল নেটওয়ার্কে বাণিজ্যিক সাইনেজের ওপর নজরদারি জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লোকসান, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম এবং রেলের বাণিজ্যিক সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার না হওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্বেগের মধ্যেই এই পদক্ষেপ এল।
গত এক দশকে সরকার নতুন রেললাইন নির্মাণ, ডুয়েল-গেজ প্রকল্প, সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্টেশন উন্নয়নের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। তবে ধীরগতির প্রকল্প বাস্তবায়ন, পুরোনো অবকাঠামো, জনবল সংকট এবং বাণিজ্যিক দক্ষতার অভাবের কারণে এই খাতটি এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছুঁতে পারেনি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলের নিজস্ব সম্পদের উন্নত ব্যবস্থাপনা সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই নতুন বিজ্ঞাপন নীতিমালার সফলতা শেষ পর্যন্ত এর সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগের ওপরই নির্ভর করছে।
গত সপ্তাহে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে বিজ্ঞাপন ও সাইনেজ নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের এই প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়। এই নীতিমালার মাধ্যমে রেলওয়ের জায়গা, স্টেশন এবং ট্রেনের ভেতরে-বাইরে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। নতুন নিয়মের অধীনে ডিজিটাল স্ক্রিন, বিলবোর্ড, নিয়ন সাইন ও মোবাইল বিজ্ঞাপনসহ সব ধরনের প্রচারণামূলক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করবে কর্তৃপক্ষ।
রেল কর্মকর্তারা জানান, এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনগুলো যেন ট্রেন চলাচল, যাত্রীদের যাতায়াত বা জননিরাপত্তায় কোনো বাধা সৃষ্টি না করে তা নিশ্চিত করা।
রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিজ্ঞাপনের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আর তাই রেলওয়ে নতুন এই নীতিমালা তৈরি করেছে যেখানে বিজ্ঞাপনের আধুনিক সব মাধ্যম ও পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নিয়মাবলীর ফলে এখন থেকে পুরো রেলওয়েতে বিজ্ঞাপন অনুমোদন, স্থাপন এবং নজরদারির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি চালু হলো।
কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, আগে কোনো সুসংগঠিত নিয়ম না থাকায় একটি বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। এর সুযোগ নিয়ে অনেকে অবৈধ বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করত, ঠিকমতো ফি আদায় করাও সম্ভব হতো না।
এই নীতিমালার একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে রেলের সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে রাজস্ব ফাঁকি বা লোকসান কমিয়ে আনা। বিশাল জমি ও স্টেশন চত্বর থেকে অর্থ উপার্জনে ব্যর্থতা এবং দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অবৈধ বিজ্ঞাপন এবং নিয়মহীন ইজারার কারণে সংস্থাটি এতদিন বড় অঙ্কের আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ সমস্যা দূর করতে নীতিমালায় বিজ্ঞাপনের স্থান ও বাণিজ্যিক মূল্যের ওপর ভিত্তি করে একটি সুনির্দিষ্ট ফি’র তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বিজ্ঞাপনের চার্জ বেশি হবে এবং ছোট জেলাগুলোতে তুলনামূলক কম হার প্রযোজ্য হবে।
পাশাপাশি বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর জন্য নীতিমালায় আরও কঠোর যোগ্যতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের কাজ পেতে চায়, তাদের এখন থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে, জামানত জমা দিতে হবে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সব পরিচালন মান মেনে চলতে হবে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে রেলকে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর অধীনে বিজ্ঞাপনদাতার খরচেই অবৈধ বিজ্ঞাপন অপসারণ, জামানত বাজেয়াপ্ত করা, সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নতুন এই পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিউআর-কোড ভিত্তিক বিজ্ঞাপন যাচাইকরণ এবং বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপনের জন্য কম্পিউটার-এইডেড ডিজাইন পরিকল্পনা। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ফলে রেলের জায়গা অবৈধভাবে দখল করা বন্ধ হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার রেল অবকাঠামো আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি টিকিট ছাড়া অন্য খাত থেকে রাজস্ব বাড়ানোর যে চেষ্টা করছে, এই নীতিমালা তারই একটি অংশ।
এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শিফুন নেওয়াজ বলেন, সরকারকে বিজ্ঞাপনের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন কোম্পানির ওপরেই ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি কক্সবাজারগামী পর্যটন ট্রেনগুলোর বাইরের অংশে দৃষ্টিনন্দন বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তবে রেলওয়ে অনেক লাভবান হবে। এতে একদিকে যেমন রেলের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে ট্রেনগুলো দেখতেও অনেক সুন্দর লাগবে।


