বিয়ের আসরে তখন আনন্দ-উৎসব চলছিল। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন। কনের বাবা-মা, ভাই-বোন, মামা ও চাচা একসঙ্গে ছিলেন। রাতের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি চলছিল। কয়েক ঘণ্টা আগে যে পরিবারটি মেয়ের বিয়েকে ঘিরে আনন্দে মেতে উঠেছিল, রাত পেরোতেই সেই পরিবারে নেমে আসে কান্না।
ফেরার পথে মাইক্রোবাসের একদম পেছনের আসনে বসেছিলেন আবুল কালাম। তার সামনে ফেরদাউস আলম ফিরোজ, এর আগে মিমতা ও একেবারে সামনে চালক মুন্না। আর কালামের পাশে ছিলেন মনজুর আলম। গাড়িটি ছুটছিল কক্সবাজারের ঈদগাহর গ্রামের বাড়ির দিকে।
আবুল কালাম বলেন, ‘চালকের পেছনে বসা ছিল মিমতা। তার পেছনে ফিরোজ। শেষ আসনে আমি। ফিরোজের পাশে মোর্শেদ আর আমার পাশে মনজুর।’
মাইক্রোবাসটি দ্রুতগতিতে মইজ্জারটেক পার হচ্ছিল। সামনে একটি কাভার্ডভ্যান ইউটার্ন নিচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোবাসের ডান পাশ কাভার্ডভ্যানটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।
‘ধাক্কার পর চালকসহ চালকের পেছনের বরাবর তিনজন সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। আমার ডান হাতের ভেইন কেটে গেছে। শরীরের কয়েক জায়গায় ব্যথা পেয়েছি। কিন্তু আমার পাশে বসা মনজুর আলমের অবস্থা গুরুতর।’ দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নগরের চকবাজার ডিসি রোডে এক স্বজনের বাসায় বসে এমন বর্ণনা দেন আবুল কালাম। তখন তার শরীর ও সাদা পায়জামা রক্তে মাখা।
এই দুর্ঘটনায় নিহত হন মনজুর আলমের মেয়ে জাছিয়া ইসমে মিমতা, ছেলে মোর্শেদ, মিমতার মামা ফেরদাউস আলম ফিরোজ ও মাইক্রোবাসচালক হাসান মোহাম্মদ মুন্না।
শনিবার মধ্যরাতে মনজুর আলমের দ্বিতীয় মেয়ে তাম্মিন ফায়েছা ফাহিমার বিয়ে ছিল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার কপারসিমনি রেস্টুরেন্টে। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে কনের পরিবার ও স্বজনেরা কক্সবাজারের ঈদগাহ উপজেলার উত্তর মাইজপাড়ার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।
ফাহিমার নতুন জীবনের শুরুটা দেখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল ভাই মোর্শেদ ও সবার ছোট বোন মিমতার।
মিমতা ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। মামা ফেরদৌস আলম ফিরোজ ঈদগাহ বাসস্টেশনের আরাফাত শপিং কমপ্লেক্সের সত্ত্বাধিকারী ও সেই মার্কেটেই নুরজাহান মেডিকো নামে তার একটি দোকান রয়েছে।
একই মাইক্রোবাসে ছিলেন কনের বাবা মনজুর আলম, মা নিলুফা ইয়াসমিন, মেয়ে জাছিয়া ইসমে মিমতা, ছেলে মোর্শেদ, মামা ফেরদাউস আলম ফিরোজ, তার স্ত্রী আরেফা বেগম, চাচা আবুল কালাম, চালক হাসান মোহাম্মদ মুন্না ও প্রতিবেশী হেলাল উদ্দিনসহ মোট ১১ জন।
পরিবারটির অধিকাংশের বাড়ি কক্সবাজারের ঈদগাহ উপজেলার ঈদগাহ ইউনিয়নের উত্তর মাইজপাড়ায়। ফিরোজের বাড়ি পোকখালী ইউনিয়নের গোমাতলী এলাকায়।
বিয়ের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে হওয়া এই পরিবারটিই কয়েক ঘণ্টা পর চারটি মরদেহের সঙ্গে বাড়ির পথে ফিরছিল।
এক গাড়িতে গিয়েছিলেন, ফিরলেন চার গাড়িতে
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকতা শেষে চারজনের মরদেহ নিয়ে যান স্বজনেরা। ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। রোববার বেলা দেড়টার দিকে চারটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।
রাতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে তারা ফিরেছিলেন এক গাড়িতে। কয়েক ঘণ্টা পর ফিরছেন চারটি গাড়িতে চারজনের নিথর শরীর নিয়ে। যে গাড়িতে ছিল বিয়ের আনন্দ, সেই গাড়ির যাত্রাই শেষ হলো শোকে।
রাত ৯টায় ঈদগাহ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মহাসড়কের প্রায় ১০০ কিলোমিটারই ঝুঁকিপূর্ণ
এই দুর্ঘটনা আবারও সামনে এনেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দীর্ঘদিনের ঝুঁকির চিত্র। স্থানীয়দের হিসাবে, গত এক বছরে এই মহাসড়কে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় শতাধিক। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের প্রায় ১০০ কিলোমিটারই ঝুঁকিপূর্ণ বলে দাবি তাদের।
সাতকানিয়া, কেরানিহাট, হাজিরাস্তা, বনপুকুর ও জাঙ্গালিয়া এলাকাগুলোতে দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন লবণ, মাছসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করে ভারী যানবাহন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব যানবাহন থেকে সড়কে ছড়িয়ে পড়া পণ্য ও বর্জ্যে অনেক জায়গায় পিচ্ছিলতা তৈরি হয়। এর সঙ্গে সরু সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, অতিরিক্ত গতি এবং অদক্ষ চালকের কারণে বাড়ছে ঝুঁকি।


