মুস্তাফা মনোয়ার। বাংলাদেশের চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, নাটক, সঙ্গীত, পাপেট-সর্বোপরি শিল্পকলার প্রায় সকল অঙ্গণে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন সময়। সারা জীবন প্রগতিশীল সংস্কৃতির এই যোদ্ধা ৯০ বছর বয়সে চেলে গেছেন না ফেরার দেশে।
শেষ জীবনে অসুস্থতায় কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। অসুস্থতার মাঝেও গত ২৫ মার্চ টাইমস অব বাংলাদেশে’ন প্রতিবেদক শাহরিয়ার মাহীকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বলেছেন নিজের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের কথা, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থার খবরে তাঁর হতাশার কথা। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন শাহরিয়ার মাহী।
ষাটের দশকে সদ্য চালু হওয়া পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দেন সুপরিচিত কবি গোলাম মুস্তাফার ছেলে মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পিটিভি ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের চাকরি ছেড়ে সেখানে কাজ শুরু করেন।
তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা, এমন এক সময় যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এটিকে ভিন্ন সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করছিল। শিল্প ও সংস্কৃতিকে মাধ্যম করেই তিনি তখন প্রতিরোধের এক নীরব ভাষা নির্মাণ করছিলেন।
এই সাংস্কৃতিক অবস্থানই তাকে সরাসরি যুক্ত করে ফেলে উত্তাল ১৯৭১-এর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি টেলিভিশনে যুক্ত ছিলেন গণসংগীত নির্মাণে।
ফজল-এ-খোদা রচিত ও আজাদ রহমানের সুর করা ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’—এই গানটির ভিজুয়ালাইজেশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গানটি সম্প্রচারের সময় দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন শত শত কণ্ঠ একসাথে প্রতিবাদে গর্জে উঠছে। টেলিভিশনের পর্দা তখন হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের এক বিকল্প মঞ্চ।
এই প্রতিরোধের ধারাই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২৩ মার্চ, পাকিস্তান দিবসে। সেই দিনটিই হয়ে ওঠে এক নীরব প্রতিরোধের দিন। পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসাবে একাই সিদ্ধান্ত নেন টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হবে না।
এই সিদ্ধান্তের কথা জানান ঘোষিকা মাসুমা খাতুনকে। অনুষ্ঠান চালিয়ে যান মধ্যরাত পর্যন্ত। রাত ১২টা ১ মিনিটে নতুন দিনের সূচনা ঘোষণা করা হয়, পতাকা না দেখিয়েই। এই প্রতীকী প্রতিবাদ পুরো নগরবাসীর মধ্যে এক ধরনের সাহস জাগিয়ে তোলে, যেন আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত তখন বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছিল।
কিন্তু প্রতিরোধের সেই সাহসের পরেই নেমে আসে ভয়াবহতা। মার্চের শেষদিকে ঢাকার বাতাসে জমে উঠছিল অজানা আতঙ্ক। ২৫শে মার্চ হঠাৎ খবর এলো,ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী বেরিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুস্তাফা মনোয়ার সতর্কবার্তা পান যে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
রাত গভীর হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কৌতূহল আর শঙ্কা নিয়ে ছাদে উঠে তাঁর স্ত্রী দেখেন, বাড়ির সামনে দেওয়া ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পুরো বাড়ির আলো নিভিয়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় গুলির শব্দ, ভারী বুটের আওয়াজ, দরজায় আঘাত। সৈন্যরা বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
বুটের শব্দ ধীরে ধীরে তাদের কক্ষের সামনে এসে থামে। একে একে ঘর তল্লাশি করে সৈন্যরা বেডরুম পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু কাউকে না পেয়ে, অন্ধকারে বিভ্রান্ত হয়ে তারা ধরে নেয়—বাড়ির সবাই পালিয়েছে। দরজার ওপার থেকেই শোনা যায়—“সব ভাগ গ্যায়া।”
পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তখন মুস্তাফা মনোয়ার সিদ্ধান্ত নেন একাই বাড়ি ছাড়ার।
তারপরই শুরু হয় তাঁর পালিয়ে বেড়ানোর সময়। দিনে এক জায়গা, রাতে অন্যত্র—প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তায় ভরা, প্রতিটি রাত আতঙ্কে মোড়া। শেষ পর্যন্ত সহকর্মীদের উদ্যোগে সিদ্ধান্ত হয়—তাকে দেশ ছাড়তেই হবে। ড. রেহামান সোবহান ও অর্থনীতিবিদ ড. আনিসুর রহমানের সঙ্গে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন।
সীমান্ত পেরিয়ে গেলেও অনিশ্চয়তা শেষ হয়নি। সেই সময় যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল রেডিও—চাদর দিয়ে ঢেকে, খুব আস্তে শব্দে শোনা হতো। স্বাধীনতার ঘোষণা, শেখ মুজিবের গ্রেফতারের খবর—সবই আসত ভাঙা ভাঙা সূত্রে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের চেয়ে আতঙ্কই তখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল।
কলকাতায় তিনি যেখানে থাকতেন তার খুব কাছেই ছিল একটি শরণার্থী শিবির। পরদিন তিনি শিবিরে গিয়ে দেখেন—কারো মুখে হাসি নেই। বিমর্ষ সবাই। প্রায় সবাই বাড়ি-ঘর জমি-জিরেত ফেলে এককাপড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। কারো আবার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে পাকহানাদাররা। এই কষ্টভারাক্রান্ত মানুষগুলোর চেহারা দেখে তিনি ভাবলেন—এদের হাসাতে হবে।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আয়োজন করলেন পাপেট শো। কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরের শরণার্থী শিবিরে প্রথম পাপেট প্রদর্শনীটি হয়।
পাপেটের খেলার মধ্যে দিয়ে তিনি দেখাতেন—ইয়াহিয়া খানকে মারছে কৃষক। আর জিজ্ঞেস করছে—‘আর কেউ কি মারতে চাও?’ তখন সবাই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে এগিয়ে আসছে অত্যাচারী ইয়াহিয়াকে মারতে। পাপেটের কারুকাজ ও কথা বলা দেখে দেশ ছেড়ে আসা দুখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটত।
এরপর থেকে তার পাপেট শো হয়ে ওঠে শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষগুলোর আনন্দের উৎস। তিনি যেখানেই যেতেন, শিশুরা তাকে ঘিরে ধরত—‘পুতুলওয়ালা, পুতুলওয়ালা’ বলে।
এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুধু বিনোদন ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত দলিল। “মুক্তির গান”-এর চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের ধারণ করা মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজেও অম্লান হয়ে আছে একাত্তরের পুতুলওয়ালা মুস্তাফা মনোয়ারের এই কীর্তি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থা হওয়ার ঘটনাগুলো তাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত সকল মানুষের জন্যই এক গভীর আঘাত। তার ভাষায়, “তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা যুদ্ধ করেছি কেন, কার জন্য? যুদ্ধের সময় জীবনের ঝুঁকি ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা; যে কোনো সময় গুলি তার গায়েও লাগতে পারত। তবু ভয়কে অতিক্রম করেছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি—ভয়, রোমাঞ্চ ও দায়বদ্ধতার সম্মিলন, যার মূল ছিল দেশকে স্বাধীন করার গভীর তাগিদ। আর আজ যখন কেউ ইতিহাস অস্বীকার বা বিকৃত করে, তখন তার মনে হয়—মানুষ কি সেই ত্যাগ ভুলে যাচ্ছে?”
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সংসদে যুদ্ধপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্বাচিত হয়ে আসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি দুঃখজনক হলেও গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ। তবে মূল প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন বেছে নিচ্ছে?। তার মতে, সমাজে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা মানুষ আবার নেতৃত্বে ফিরে আসতে পারছে।
তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার পর কোনো দেশই সঙ্গে সঙ্গে আদর্শ অবস্থায় পৌঁছায় না। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের রূপ বদলায়। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মানসিকতা ও মূল চেতনা মানুষকে একত্র করেছিল, সেই চেতনা আর আগের মতো নেই; সময়ের সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়েছে।
দ্বিতীয় ‘স্বাধীনতা’র তত্ত্ব সম্পর্কে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। বলেন, “স্বাধীনতা একটাই, আর সেটি অর্জিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। পরবর্তীকালের আন্দোলনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাধীনতার সমতুল্য নয়। কারণ স্বাধীনতা মানে একটি জাতির অস্তিত্ব, পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা—যা একাত্তরেই অর্জিত হয়েছে”।
অতীত ও বর্তমান সময়ের মানুষের মানসিকতার পার্থক্য নিয়ে তিনি বলেন, তখন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে কাজ করত, দেশকে ভালোবাসত এবং একসঙ্গে লড়ত। অনেকেই জীবন ঝুঁকি নিয়েছে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই। সেই সময়টা ছিল ঐক্যের সময়। আর বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই চেতনার ঘাটতি দেখা যায়; কিছু ক্ষেত্রে দেশপ্রেম যেন লোক দেখানো হয়ে গেছে।
এইভাবেই মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনগাথা আমাদের সামনে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন মুখ—যেখানে বন্দুকের শব্দের পাশাপাশি ছিল পুতুলের হাসি, আতঙ্কের ভেতরেও ছিল শিল্পের আলো, আর যুদ্ধের মধ্যেও ছিল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার এক গভীর মানবিক প্রয়াস।


