দেশজুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর বার্তা ও নিরন্তর অভিযান চললেও থামছে না এই মরণনেশার কারবার। মাদক সংক্রান্ত মামলায় আদালতের বারান্দায় ভিড় বাড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে এর মূল হোতা বা গডফাদাররা। প্রতিনিয়ত পুলিশের অভিযানে মাদক বহনকারীরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও আইনি দুর্বলতা ও প্রমাণের অভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা জামিনে বেরিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়াই অপরাধ প্রবণতা না কমার প্রধান কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশের প্রচলিত আইনগুলো বেশ পুরনো হওয়ায় সেখানে অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। এরই সুযোগ নিয়ে প্রধান আসামিরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে মাদক মামলায় শাস্তির নজির খুবই কম। সাধারণত যারা মাদক বহনকারী তারাই ধরা পড়ে, কিন্তু নেপথ্যের গডফাদাররা আড়ালেই থেকে যায়। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
মামলা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৮ হাজার ৮৩৭ পিস ইয়াবাসহ ফিরোজ আহাম্মেদ ও আবু শামিম নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিদর্শক আজাদুল ইসলাম সালাম বাদী হয়ে এ বিষয়ে মামলা করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ চার্জশিট দাখিল করলে সেখানে বহনকারীসহ আরও আটজনের নাম উঠে আসে। তবে বর্তমানে আসামিরা সবাই জামিনে রয়েছেন। এই মামলার বাদী আজাদুল ইসলাম সালাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আটকের পর আসামিদের এভাবে জামিন পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু তারা ঠিকই আদালত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যায় গত বছরের নভেম্বরে পল্টন থানা এলাকার একটি অভিযানে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা পার্সেলের প্রতিনিধি জুবায়েরকে আটকের পর আধুনিক মাদক চোরাকারবারী চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। জুবায়েরের দেওয়া তথ্যে অপূর্ব রায় ও সৈয়দ শাইয়ান আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, তারা আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারী দলের সক্রিয় সদস্য এবং উন্নত দেশ থেকে পার্সেলের মাধ্যমে মাদক আমদানি করে তরুণ প্রজন্মের কাছে বিক্রি করত। তবে এই মামলার আসামিরাও এখন জামিনে মুক্ত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় থাকায় চার্জশিট দিতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। আর আসামিদের জামিন দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার।
মাদক প্রসিকিউশনের (দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম মনে করেন, আটকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গডফাদারদের ধরার চেষ্টা করা হলেও আইনি ও তথ্যগত দুর্বলতার কারণে আসামিদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
একইভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল কাদের জানান, আসামি ধরা হলেও তাদের জামিন পাওয়া বা না পাওয়া নির্ভর করে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আসামির স্বীকারোক্তির ওপর।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী এই পরিস্থিতির জন্য প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দেশের চারপাশ দিয়ে মাদক ঢুকছে। এর সঙ্গে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তানসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। সাক্ষী না পাওয়া এবং প্রমাণের অভাবে আসামিরা সহজেই মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, যারা গ্রেপ্তার হয় তারা মূলত গডফাদারদের কর্মচারী। কর্মীরা জেলে গেলে গডফাদাররাই আইনের ফাঁক দিয়ে তাদের বের করে আনে।
তিনি মনে করেন, জামিনের ক্ষেত্রে আইনের কোনো দুর্বলতা নেই। বরং সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া এবং যথাযথ নথিপত্রের অভাবেই আসামিরা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে এই গডফাদারদের সিন্ডিকেট ধ্বংস করা জরুরি।


