দেশের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের এই নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর প্রথম প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেড় দশকেরও বেশি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর লাখ লাখ ভোটারের জন্য একটি অর্থবহ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার এটিই প্রথম সুযোগ।
সংসদের ২৯৯টি আসনের বিপরীতে এবার লড়ছেন এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী, যা ২০২৬ সালে সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক আয়োজন। শেখ হাসিনা তার শাসনামলে তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন উপহার দিয়েছিলেন। ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি, আর ২০১৮ সালের নির্বাচনটি কারচুপির অভিযোগে ছিল কলঙ্কিত।
প্রায় ১৮ মাস আগে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশা এমনই আকাশচুম্বী যে, সবাই বিশ্বাস করে এটি সাংবিধানিক বৈধতা ফিরিয়ে আনবে। দীর্ঘ এক প্রজন্ম পর দেশে এমন এক সরকার গঠন করবে যাদের পেছনে থাকবে জনগণের প্রকৃত সমর্থন।
তবে এই নির্বাচন গণতন্ত্রের পথে বড় পদক্ষেপ হলেও এটি যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও জটিল ও অস্থির এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বর্তমানে স্থগিত আছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। নির্বাচনী লড়াইয়ে তাদের অনুপস্থিতিতে রাজনীতির মাঠ এখন দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এই নতুন মেরুকরণ নির্বাচনের উত্তাপ ও গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে এই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশ অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং নজিরবিহীন নিরাপত্তা ঝুঁকির মোকাবিলা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনরুদ্ধারের জন্য গত দুই দশকের মধ্যে এটিই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। কিন্তু কেবল বৈধতা থাকলেই যে দেশ চালানো সহজ হবে, তেমন গ্যারান্টি দেওয়া যাচ্ছে না।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক প্রচার শেষে দেশের জন্য দুটি ভিন্ন ধারার রূপরেখা দিয়েছেন। সব সমীকরণে বিএনপিকে জয়ের দৌড়ে এগিয়ে রাখা হলেও, হাসিনা সরকারের পতনের পর জামায়াত তাদের সাংগঠনিক শক্তি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনজোয়ারকে তারা এখন সংসদীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে মরিয়া।
উভয় শিবিরেরই কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে যা নির্বাচন-পরবর্তী সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিএনপির তৃণমূলের কিছু অংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তিতে কালো দাগ ফেলেছে।
অন্যদিকে, জামায়াত এখনো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতার দায় এবং নারী অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের কট্টর অবস্থানের কারণে সমালোচিত, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।
এবারের ভোট যদি শান্তিপূর্ণ হয় এবং সব পক্ষ ফলাফল মেনে নেয়, তবে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বৈধতার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করবে। কিন্তু এই মুহূর্তটিকে শেষ গন্তব্য ভাবলে ভুল হবে; এটি মূলত এক সংকটময় সন্ধিক্ষণ।
আসল পরীক্ষা শুরু হবে নির্বাচনের পর। নির্বাচনী বৈধতাকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে রূপান্তর করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ। শেখ হাসিনার পতনের পর কট্টর ইসলামি শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে, যাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা পরবর্তী সরকারের জন্য হবে বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে, আত্মগোপনে থাকা বা মামলার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারাও খুব বেশিদিন চুপ করে থাকবেন না। রাজনীতিতে ফেরার জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন।
প্রতিশোধপরায়ণ আওয়ামী লীগ, উজ্জীবিত জামায়াত, কট্টরপন্থিদের পুনরুত্থান এবং একটি দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র মিলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসও খুব একটা আশার কথা শোনায় না। বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী ইতিহাস বরাবরই সহিংসতা, রাজপথের সংঘাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতায় ঘেরা। সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে ফেরা বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা দেয়নি, বরং রাজপথের লড়াই ও সংসদ বর্জনের এক নেতিবাচক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল।
২০০১ সালের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেও পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নিগ্রহের ঘটনা ঘটে। এমনকি ২০০৮ সালের ভূমিধস বিজয়—যাকে গণতন্ত্রের নতুন শুরু বলা হয়েছিল—তাও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পথ তৈরি করেছিল। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন বারবার রাজনৈতিক সংকট মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং এটি সংকটকে কেবল নতুনভাবে বিন্যাস করেছে।
তাই এবারের ভোট যত স্বচ্ছ আর শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, আসল চিন্তা শুরু হবে ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই।


