সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে বেতন বাড়ানো কথা বলা অথবা এখন তা থেকে সরে আসা, দুটি সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে।
রোববার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার।’
আগে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় বেড়েছে ক্ষোভ।
অর্থনীতিবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তুলেছেন—এত বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা থেকে সরে আসার যৌক্তিকতা কী!
তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করা। কিন্তু বড় আর্থিক প্রভাব তৈরি করতে পারে এমন সিদ্ধান্তে জড়িয়ে পড়েছিল সরকার, তার মধ্যে সরকারি বেতন কাঠামোর সংস্কারও ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সরকারের একটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। তা হলো, নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে না পারা।
‘বেতন যখন বাড়াবেন না, তখন বেতন কমিশন গঠন করা হলো কেন? কর্মকর্তাদের মধ্যে অযথা প্রত্যাশা তৈরি করারই–বা দরকার কী ছিল?’ বলেন তিনি।
হুট করে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার এ প্রবণতা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের আস্থার সম্পর্ক দুর্বল করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাছাড়া এর প্রভাব পড়তে পারে পরবর্তী নির্বাচনেও।
‘সরকারের ওপরই যদি আস্থাই না থাকে, তাহলে কর্মকর্তারা কেন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন?’ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর অর্থ উপদেষ্টা বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে এবং এ–সংক্রান্ত গেজেটও প্রকাশ করা হবে।
তখন তিনি আরও বলেছিলেন, বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে না সরকার।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত স্থিরতার অভাবকেই সামনে এনেছে।
‘দৃশ্যমান যে সরকার নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারেনি। যাই হোক, তবে শেষ পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সরকারি বেতন বাড়ালে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো।
‘ব্যবসায়িক খাত এমনিতেই এখন চাপে আছে। এ সময়ে সরকারি বেতন বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ত, আর তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ত নিম্ন আয়ের মানুষ,’ বলেন তিনি।
চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ গঠন করে সরকার, যার দায়িত্ব ছিল সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে একটি যৌক্তিক কাঠামোর সুপারিশ করা।
কমিশনকে ছয় সদস্যের পরিবারের জীবনযাত্রার খরচ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মেধাবী কর্মকর্তাদের ধরে রাখার মতো বিষয়াদি বিবেচনায় নিতে বলা হয়। প্রথম সভা থেকে ছয় মাসের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়।
সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের এভাবে সরে আসা হতাশা সঞ্চার করেছে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে।
অর্থ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত শুনে আমি খুবই হতাশ।’
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন বেতন বৃদ্ধির আশা করে ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটল।’


