প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘স্বাস্থ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ, বিজ্ঞানের পাশে দাঁড়াই’। এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভুল তথ্য প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা।
বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অবহেলা করা হচ্ছে। নারীর স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা মানে বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা করা। এর ফলে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং অন্যান্য নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্রসমূহকে অবশ্যই নারীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে। এটি বিশ্বের প্রতিটি নারী ও কন্যাশিশুর জন্য মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরুষের তুলনায় (১৫.৭%) নারীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার প্রকোপ অনেক বেশি (২১.৫%)। পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ঘর ও কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত কাজের চাপে নারীরা মূলত উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমিত ক্ষমতা এবং করোনাকালে ঘর ও অফিসের কাজের বাড়তি চাপ তাদের এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মানসিক সমস্যার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও ৯০ শতাংশের বেশি নারী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বা সঠিক সেবা পান না। লোকলজ্জার ভয় ও সম্পদের অভাবে নারীরা পেশাদার চিকিৎসকের বদলে পরিবার বা বন্ধুদের মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ খুবই সীমিত। গভীর সামাজিক কুসংস্কারের কারণে নারীরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে বা সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করেন। এছাড়া শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাবও তাদের চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জোরদার করা, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং নারী ও তাদের পরিবারের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
গবেষণায় বাংলাদেশের নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ২ থেকে ৩ গুণ বেশি। দেশে মানসিক রোগীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নারী। তাদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ নারী সঠিক চিকিৎসা পান। এই পরিসংখ্যান কেবল স্বাস্থ্য সংকটই নয়, বরং বিশাল এক চিকিৎসা বৈষম্যকেও নির্দেশ করে যার ফলে লাখ লাখ নারী নীরবে কষ্ট পাচ্ছেন।
দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা নারীদের ওপর অসম প্রভাব ফেলে। পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও স্বল্প মজুরির কারণে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন। নারীর অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা বা অর্থনৈতিক নির্যাতনও এক ধরনের পারিবারিক সহিংসতা। সমাজ নারীদের ওপর কিছু সুনির্দিষ্ট বোঝা চাপিয়ে দেয়। পোশাক নিয়ে সমালোচনা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, চলাফেরায় বাধা এবং পরিবার বা সমাজের কঠোর নজরদারি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীদের পুরুষের মতো সমান অধিকার ও স্বাধীনতা থাকা উচিত।
অনেক নারী অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বা সামাজিক অপবাদের ভয়ে সহিংস পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। সহিংসতার ট্রমা থেকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) হতে পারে। এটি একটি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদী মানসিক অবস্থা যা কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা বা সহিংসতা দেখলে বা অনুভব করলে তৈরি হয়। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে মেজাজের পরিবর্তন, দুঃসহ স্মৃতি বারবার ফিরে আসা, ভীতিজনক বিষয় এড়িয়ে চলা এবং সবসময় আতঙ্কিত থাকা। এটি দৈনন্দিন জীবন, কাজ ও সম্পর্কের ক্ষতি করে যার জন্য পেশাদার চিকিৎসা প্রয়োজন। এছাড়া মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা এবং প্রসব-পরবর্তী হরমোনের পরিবর্তনও নারীর মনে প্রভাব ফেলে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও নারীর সুস্থতার বিষয়টি এখনও উপেক্ষিত রয়ে গেছে। লিঙ্গভিত্তিক চাপ ও সামাজিক সংস্কারের কারণে নারীরা প্রায়ই হীনমন্যতায় ভোগেন। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক জড়তা থাকায় নারীদের জন্য সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সহায়তা নিলে জীবনের মান উন্নত হয় এবং কাজের দক্ষতা বাড়ে।
কর্মক্ষেত্রেও নারীরা বার্নআউট, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো অনন্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। গৃহস্থালি কাজের দায়িত্ব, বেতনের বৈষম্য এবং লিঙ্গ বৈষম্য এর প্রধান কারণ। কাজের জায়গায় ভারসাম্যহীনতা এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর অভাব এই চাপ আরও বাড়ায়। এই সমস্যা সমাধানে নমনীয় কর্মঘণ্টা, হাইব্রিড কাজের সুযোগ এবং মাতৃত্বকালীন সহায়তার মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। উচ্চপদে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকায় অনেক সময় তারা একাকীত্ব বোধ করেন। কর্মক্ষেত্রে মেনোপজ বা প্রসব-পরবর্তী সময়ে সঠিক সমর্থন না পাওয়ায় অনেকের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বেড়ে যায়। তাই শিশু যত্ন কেন্দ্র বা ছুটির পর কাজে ফেরার বিশেষ কর্মসূচি মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী নারীরা আরও বেশি প্রতিকূলতার শিকার হন যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়। নারীদের ওপর ঘর ও সন্তান লালন-পালনের বাড়তি দায়িত্ব থাকায় তাদের পেশাদার কাজের মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং ক্লান্তি বাড়ে।
প্রতিটি নারীর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো নারীরই নীরবে সহ্য করা উচিত নয়। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনের জন্য নারীর স্বাস্থ্যের উন্নয়ন অপরিহার্য। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে নারীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।
প্রবাদ আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আমাদের আজ থেকেই নারীর মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধে কাজ করতে হবে যাতে তারা একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জীবন পায়। এটি কোনো বিশেষ সুযোগ নয়, বরং নারীর মৌলিক অধিকার।
লেখক: স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক এবং গবেষক।


