সাধারণত বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর গভীর আগ্রহ দেখা যায়। বিবৃতি, বক্তব্য দিয়ে তারা নির্বাচনের, ভোটাধিকার পরিস্থিতির নানা খবরাখবর নেন; নিজেদের মত প্রকাশ করেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পশ্চিমা কূটনীতিকদের আচরণ ‘অস্বাভাবিক রকম নীরব’ বলেই মনে হচ্ছে।
গত তিনটি ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে, পশ্চিমা কূটনীতিকরা বারবারই নির্বাচনকে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক’ করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। তারাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। এর বদলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত শাসনে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারে এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নীরবে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশে তাদের অবস্থান কী হবে সেটি নির্ধারণের আগে পশ্চিমা দেশগুলো নতুন রাজনৈতিক পটভূমি এবং এর প্রধান কুশীলবদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনী বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর আস্থা রেখে পশ্চিমা দেশগুলো এখন কম উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, ‘দেশগুলো বিশ্বাস করে যে এই সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারবে।’
আরেক সাবেক কূটনীতিক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশগুলোর নিজস্ব মতামত অবশ্যই আছে, কিন্তু তারা এখনই কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দিচ্ছে না। আমার ধারণা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেই তারা কথা বলবে।’
ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা একটি দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কাছে প্রশ্ন ছিল, কেন তাদের মিশন এবার নীরব?
জবাবে তিনি বেশ মজার মন্তব্য করলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন নীরব আছি সে বিষয়ে মন্তব্য করার অনুমতিও আমাদের নেই।’
আগের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সরকারগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছিল। কূটনীতিকদের বিবৃতি এবং পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আসা আনুষ্ঠানিক বার্তায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর বারবার জোর দেওয়া হচ্ছিল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা সফর করেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। সফরে তিনি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেন।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন: ‘আমি সব প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের তাদের সহযোগীদের হাতে এমন ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি যাতে তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় খুঁজে বের করতে গঠনমূলক সংলাপে বসতে পারের। যা বাংলাদেশের মানুষের চোখে বিশ্বাসযোগ্য হবে।’
ওই নির্বাচনের বিষয়ে সেসময়কার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অতুল ক্যাশপ ওয়াশিংটনের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি জোর দিয়ে বলেন: ‘আমরা বিশ্বাস করি যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন একটি সংলাপ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে এমন একটি নির্বাচনের বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো যায় যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হতে পারে।’
যুক্তরাজ্যও সেসময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ২০১৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন ব্রিটিশ এমপি অ্যান মেইন সংসদে বাংলাদেশের নির্বাচনের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
জবাবে তৎকালীন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন যে, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এক বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সরাসরি উদ্বেগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তিনি এটাও বলেন, ১ নভেম্বর তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে ফোনালাপে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ একটি বিবৃতিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। কারণ ওই নির্বাচনে সব প্রধান রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। ইইউ রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে বলে, ‘ইইউ সকল অংশীজনকে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে সম্মান করতে এবং শান্তিপূর্ণ সংলাপে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সেন্সরশিপ বা প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে পারা অপরিহার্য।’
ডেভিড ব্রুস্টার মনে করেন যে, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলো সমাজের সকল অংশকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি এমন উদ্বেগ ছিল। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশ সরকার কীভাবে নির্বাচিত হয় এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে শাসিত হবে তা পরিবর্তন করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
তবে নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে অনেকাংশেই অনাগ্রহী। বাংলাদেশিদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়, মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বাংলাদেশে নির্বাচন এখন আর তাদের জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয় নয়।
কূটনৈতিক সুরে পরিবর্তন
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক দেশের সরকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশকে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশের তুলনায় উন্মুক্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে দেখছে। সে সময় গণতন্ত্র, নির্বাচন, আইনের শাসন, নাগরিক সমাজের পরিসর, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমাদের নিয়মিত বিবৃতি দিতে দেখা যেত।
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রেক্ষাপট নতুন এবং কুশীলবরাও নতুন। এটি এখন একটি ভিন্ন জগত। গত দুই দশকে বাংলাদেশ আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি মনে করে যে তারা পুরোনো পদ্ধতিতে দেশ শাসন করতে পারবে, তবে তারা ভুল করবে।’
তিনি এটাও বলেন যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তথ্য সংগ্রহ করছে, উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করছে এবং তারা বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী গতিপথকে কীভাবে রূপ দিতে পারে তা মূল্যায়ন করছে।
উদীয়মান শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বোঝার জন্য বিদেশী কূটনীতিকরা এখন প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখনো অসংগঠিত। ‘কূটনীতিকরা যদি মনে করতেন যে বিএনপিই একমাত্র প্রভাবশালী খেলোয়াড়, তাহলে অন্যান্য দলের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কম হতো। কিন্তু তারা এখন পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি জটিল হিসেবে দেখছেন।’
তিনি যোগ করেন যে, সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো বিদেশি মিশনগুলোর মধ্যে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তারা মনে করছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এটি অবশ্যই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘রাজনীতির এই খেলা, খেলার নিয়ম এবং এর ফলাফল নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অংশীজনদের জন্য তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোটাই স্বাভাবিক। যাতে তারা সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং পরবর্তী নির্বাচনের সম্ভাব্য বিজয়ীদের সম্পর্কে বুঝতে পারে।‘


