বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে।
বুধবার বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনের বৈঠকে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এদিনের প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপিত হয়।
রফিকুল ইসলাম হিলালী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী ও বহুমুখীকরণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চেয়েছিলেন।
লিখিত জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কোনো একক অঞ্চল বা শক্তিকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল না থেকে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রদর্শিত বাস্তববাদী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।’
অতীতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অতীতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট- পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা আমাদের কূটনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি।’
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গেও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’
আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরায় কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বিমসটেককে গতিশীল করতেও কাজ চলছে।
মন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক কূটনীতি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণে কার্যকর নীতিগত সহায়তা দেয়। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে ওই ধারাবাহিকতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উদ্ভাবন, গবেষণা, সরবরাহ শৃঙ্খল সংযোগ ও ব্লু ইকোনমির মতো নতুন ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়তে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক বাজার ও পণ্যের একটি ম্যাপিং তৈরি করছে।
জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণকে বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী ও ফলপ্রসূ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কার্যকর বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা সুদৃঢ় করবে ও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বেগবান করবে।’


