সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যা চলতি বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
সোমবার বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতনস্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করছেন।
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ ও সবনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে। যা বাস্তবায়িত হবে তিন ধাপে। এ ক্ষেত্রে গ্রেড-১ এর জন্য ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের জন্য বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৯ম পে-স্কেল অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এর আগে, সোমবার সকালে নতুন পে-স্কেল নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান, সরকারের ওপর সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে এবং এর ফলে বাজেট ও অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেতনস্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকার এটি একযোগে বাস্তবায়ন না করে চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বল্প আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ধাপে ধাপে নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ
নতুন বেতনস্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
পেনশন বাড়বে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ
অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনধারীদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনধারীদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনধারীদের বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনধারীদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ।
সরকারের মতে, এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি সুবিধা পাবেন।
চালু হচ্ছে প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয়ের বিষয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। এতদিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেলেও নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী সব গ্রেডের কর্মচারী এ ভাতা পাবেন।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা One Rank One Pension (OROP) পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের।
তবে এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের তথ্য না থাকায় সরকার এটি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উপকৃত হবেন প্রায় ২৪ লাখ কর্মচারী
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। Medium Term Budget Framework অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
এদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। এটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সরকারের আশা, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে অর্থ বিভাগ। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান থাকবে।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সেই কমিশন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা সুপারিশ করে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে ১০ সদস্যের কমিটি করে সরকার।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
আরও পড়ুন>>>
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হচ্ছে দ্বিগুণ, পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত
১ জুলাই থেকে আসছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল


