আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়ে নির্বাচনে জিতে আসা একজন সংসদ সদস্য বিএনপির নবগঠিত মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। তিনি হলেন সিলেট-১ আসনের সাংসদ খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বিএনপি চেয়ারম্যান ও নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সই করা নথি অনুযায়ী, নতুন সরকারের বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন সাবেক এই ব্যবসায়ী নেতা।
এই মন্ত্রীর অধীনে দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি থাকবে। তিনি শিল্পায়ন ও শিল্পখাতের নীতিগত তদারকি এবং রপ্তানি উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা দেবেন। তৈরি পোশাকসহ বস্ত্র খাতের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা এবং পাট ও পাটপণ্যের উন্নয়ন ও বিপণনও এই মন্ত্রণালয়ের আওতায় পড়ে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের বাজার হস্তক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের সার্বিক তদারকিও এই মন্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
এদিকে, বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি’র নয়জন সদস্য রয়েছেন, যাদের নাম খেলাপির তালিকায় ছিল। তবে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছেন।
মোট ৪৫ জন খেলাপি ব্যক্তি এমন স্থগিতাদেশ সুবিধা ভোগ করে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন যাদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি সহ ১১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। এদের মধ্যে বিএনপি থেকে ১১ জন জয় পান ও অর্থ পরিশোধ করে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জামায়াতের একজন জয়লাভ করেন। বিএনপি থেকে জয় পাওয়া দুইজনের মামলা আপিল বিভাগে চলমান থাকায় তাদের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি।
দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণে জর্জরিত। মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি, টাকার অঙ্কে যা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উলঙ্গ লুটপাটে আর্থিক খাতের এই দশা। তবে বিএনপির দাবি, তাদের নেতারা আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্রীয় নিপীরণের কারণে ব্যবসা করার সুযোগ না পাওয়ায় খেলাপি হয়ে পড়েছেন।
খেলাপি ব্যক্তিদের সংসদে আসা ও মন্ত্রীসভায় স্থান পাওয়ার বিষয়টি খেলাপি সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বাতা দেবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, যেহেতু তারা আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সংসদে ও মন্ত্রীসভায় এসেছেন, তাই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে না। তবে দেখার বিষয় হলো, নতুন সরকার খেলাপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।
‘সব জায়গায় ধোয়া তুলসি পাতা পাওয়া যাবে না’-এমন আক্ষেপ করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নতুন সরকার আর্থিক খাতে কী ধরনের সংস্কার করছে এর ভিত্তিতেই জনগণের কাছে বার্তা যাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) সূত্রে জানা গেছে, খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের মালিকানাধীন এফএম ইয়ার্ন ডায়িং এবং মাগনুম এন্টারপ্রাইজের ঋণ খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। এগুলো নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানোর ওপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে।
স্থগিতাদেশ নিয়ে এমপি যারা
আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় পাওয়া বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, কুমিল্লা-১০ আসনের মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৯ আসনের মো. আবুল কালাম, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ আসনের মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তবে সারোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরীর মামলা আপিল বিভাগে চলমান থাকায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রয়েছে।
এদিকে, ঋণখেলাপি থাকায় শুরুতে প্রার্থীতা বাতিল হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের। তিনি নির্ধারিত তারিখের পরে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করে আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পান এবং যশোর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন।


