ফসলের বাম্পার ফলন নিয়েও টানা চার বছর ধরে প্রায় ১০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি এবং কৃষি উপকরণের চড়া দামে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন নওগাঁর কৃষকরা। গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধানের দাম অন্তত ১০০ টাকা কমে গেছে।
দেশে ধানের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলা। এখানকার চাতাল ও রাইস মিলগুলো সারা দেশের চালের চাহিদার একটা বড় অংশ জোগায়। ধান আর আমের ওপর ভর করে এ অঞ্চলের অর্থনীতি। গত দশ বছরে এখানে আমের উৎপাদন পাঁচ গুণ বাড়লেও, কৃষকরা বলছেন এখন আর আম চাষ নতুন করে বাড়ছে না। অন্যদিকে তাদের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে চলতি বোরো মৌসুমে। এবার ধানের ফলন চমৎকার হলেও লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না চাষিরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। আর ধান উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৫ টন। কৃষকরা বিঘাপ্রতি ২২ থেকে ২৪ মণ করে ভালো ফলনও পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজারের ধানের দাম তাদের ভাবনার চেয়ে অনেক কমে গেছে, দিন দিন তা আরও নামছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের চাষি রুবেল হোসেন জানান, এবার ধানের দাম গত বছরের চেয়ে মণে প্রায় ১০০ টাকা কম। লোকসানের ভয়ে তিনি অল্প কিছু ধান বিক্রি করে বাকিটা ঘরে রেখে দিয়েছেন। কৃষকরা যে সবসময়ই ঠকেন, সেই আক্ষেপ করে রুবেল বলেন, শুধু ধান বেচে এখন সংসার চালানো দায়। সরকারের উচিত কৃষকদের বাঁচাতে এই খাতে বাড়তি নজর দেওয়া।
বিষয়টি এখন রাজনীতিতেও গড়াচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার গত দশ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম সরকারিভাবে ধান কেনার দাম বাড়ায়নি, প্রতি কেজি ৩৬ টাকাতেই আটকে রেখেছে। অথচ কৃষি বিভাগের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, এবার ধান উৎপাদনের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত মে মাসে দেশের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে, তা থেকে এখনো বের হওয়া যায়নি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বাজারে চালের দাম সরকারি হিসাবে না কমলেও, তা কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে মিলছে না। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে। তার ওপর হাওরাঞ্চলে বন্যা-বাদলে ফসল নষ্ট হওয়ায় প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ এখন অনেক বেশি। চাষিদের প্রশ্ন, সব জিনিসের দাম যখন চড়া, তখন তাদের কষ্টের ধানের দাম কেন কমবে?
মান্দা উপজেলার চাষি হামিদুর রহমান জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান বুনেছিলেন, ফলনও হয়েছে বিঘাপ্রতি ২২ মণ। কিন্তু সার, কীটনাশক, সেচ আর কামলা খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় তার খরচই হয়ে গেছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এখন বাজারে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২১০ টাকা করে বেচে তার ঘরে আসছে ২৬ হাজার ৬২০ টাকা। অর্থাৎ, বিঘাপ্রতি লাভ থাকছে মাত্র সাড়ে আট হাজার টাকার মতো। এই সামান্য টাকা দিয়ে সামনে আমন চাষের খরচ জোগানো আর পরিবার চালানো কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে তিনি দিশেহারা।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ার ভয়ে সরকার ধানের দাম বাড়াচ্ছে না, এটা ঠিক নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, অথচ কৃষি, মৎস্য বা পাটের মতো জায়গায় সরকারি সাহায্য কমে যাচ্ছে। জাতীয় বাজেটে কৃষিকে মুখে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাস্তবে ও কাজের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
নওগাঁর হাটবাজারগুলোর অবস্থাও বেশ করুণ। আবাদপুকুর হাটে গুটি স্বর্ণা প্রতি মণ ১ হাজার ১৬০ টাকা, স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১ হাজার ২১০ টাকা এবং মিনিকেট ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চকগৌরি হাটে জিরাশাইল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়।
রানীনগরের চাষি প্রদীপ কুমার দুঃখ করে বলেন, চাল-ডাল-তেলের দাম বাড়ছে, অথচ ধানের দাম মণে ৮০-১০০ টাকা কমে গেছে। এভাবে চললে চাষবাস ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
কৃষকদের এই বিপদে আরও বড় বাধা সরকারি গুদামে ধান বেচতে যাওয়া। ধানে একটু আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব থাকলেই সরকারি কর্মকর্তারা ছোট চাষিদের ফিরিয়ে দেন। এই ঝামেলার কারণে চাষিরা সরকারি গুদামে না গিয়ে কম দামে স্থানীয় মিল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। কৃষকদের অভিযোগ, মিল মালিকেরা সবাই মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে ধানের দাম কমিয়ে রাখে। ফলে চাষিদের আর দরদাম করার উপায় থাকে না।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরও এই নিয়মকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ধান একটু ভেজা থাকলে দাম কিছুটা কমিয়ে কেনার ব্যবস্থা রাখা উচিত, সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি আরও জানান, বাজারে চালের দাম চড়া থাকলেও কৃষকরা দাম পান না। ধান কাটার পর পরই টাকার জরুরি প্রয়োজনে কৃষকরা কাঁচা ধান ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা মণে সস্তায় বেচে দেন। ফড়িয়া আর চাতাল মালিকেরা সেই ধান কিনে শুকিয়ে ১০০০ থেকে ১১০০ টাকায় নিজেদের মধ্যে হাতবদল করে। পরে এই বড় বড় ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটগুলো ধান মজুদ করে চাল বানিয়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা লাভ করে। আর আসল কৃষক ন্যায্য লাভ থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।
অবশ্য বাজার কারসাজির এই অভিযোগ মানতে নারাজ নওগাঁ জেলা ধান ও চাল কল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার। তিনি বলেন, এখন বাজারে এক সঙ্গে অনেক ধান আসায় দাম কিছুটা কমেছে। সামনে আউশ চাষের খরচের জন্য কৃষকেরা তাড়াহুড়ো করে ধান বিক্রি করছেন। তবে কিছুদিন পর দাম বাড়তে পারে।
যদিও সাধারণ নিয়ম হলো, ছোট কৃষকদের ঘরের ধান শেষ হয়ে যাওয়ার পরই কেবল বাজারে দাম বাড়ে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কৃষকের ধানের দাম কমলেও সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে চালের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।
কৃষক নেতা জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, চাষিদের কষ্টের কোনো মূল্যায়ন নেই। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে সরকারকে মোট ধানের অন্তত ৪০ শতাংশ সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ভালো দামে কিনতে হবে। তা না হলে কৃষকেরা চাষ করা বন্ধ করে দেবেন, যা দেশে বড় খাদ্য সংকট তৈরি করবে। তখন বিদেশ থেকে চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
তবে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান মনে করেন, ধানের দাম কম পাওয়ার মূল কারণ সঠিক সময়ের অভাব। কৃষকেরা ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই তা বাজারে নিয়ে আসেন বলে ভালো দাম পান না।
তিনি পরামর্শ দেন, ধান ঘরে তুলে যদি মাত্র কয়েক সপ্তাহ শুকিয়ে ধরে রাখা যায়, তবে বাজারে অবশ্যই অনেক ভালো দাম পাওয়া সম্ভব।


