গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’-এ হামলা চালিয়ে আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে হত্যা করা হয়। তিনি নিজেকে ওই দরবারের প্রধান পীর হিসেবে পরিচয় দিতেন।
ঘটনার আগের দিন শুক্রবার সকালে তার কয়েক বছর আগের ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
এর জেরে ১১ এপ্রিল সকালে দরবার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয় এবং দুপুরের পর তারা সংঘবদ্ধভাবে দরবারে হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
গত সোমবার গভীর রাতে দৌলতপুর থানায় মামলাটি করেন শামীমের ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান। মামলায় আসামি হিসেবে আছে জমায়াত ও খেলাফত ইসলামের নেতাকর্মীদের নাম।
এতে প্রধান ও হুকুমের আসামি করা হয়েছে স্থানীয় জামায়াতের নেতা মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে (৩৮)। তিনি কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য। তার বাড়ি ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে। জামায়াত কর্মী রাজিব মিস্ত্রী, খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ ও আবেদের ঘাট এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক সাফির নামও আছে আসামির তালিকায়।
মামলার এজাহারে চারজনের নাম ও পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর দারোগার মোড় এলাকার গাজী মিস্ত্রীর ছেলে রাজীব মিস্ত্রীকে (৪৫)। ৪ নম্বর আসামি হলেন ইসলামপুর (পূর্ব পাড়া) গ্রামের বাসিন্দা মো. শিহাব। এ ছাড়া, অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে।
এদিকে ছয় দিন পেরিয়ে যাবার পরও গ্রেপ্তার হয়নি কোনো আসামি। উল্টো সংবাদ মাধ্যমকে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন হামলার মূল আসামি মুহাম্মদ খাজা আহমেদ। তার সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনার আগে সেখানে একটি বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা না হওয়ায় তিনি অংশ নেননি। পুলিশ এদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি, যদিও ভিডিও ফুটেজে অনেকের ছবিই স্পষ্ট।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে এবং জড়িত যারা ছিল তাদের ধরার চেষ্টা করছে। আমরা বেশ কয়েকজনকে সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে আইডেন্টিফাই করেছি। আইডেন্টিফাই করে তাদেরকে ধরার জন্য পুলিশ আন্তরিকভাবেই অভিযান চালাচ্ছে এবং চেষ্টা করছে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসামিদের এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাদের সরব উপস্থিতি আছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’
এজাহারে ফজলুর রহমান লেখেন, গত ঘটনার দিন বেলা পৌনে ৩টার দিকে তার ভাই আব্দুর রহমান তার বাড়িতে অবস্থিত দরবারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় খাজা আহমেদের হুকুমে এজাহারভুক্ত আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জন আসামি একযোগে সংঘবদ্ধ হয়ে হাতে লোহার রড, হাঁসুয়া, দা, ছুরি, কুড়াল, বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম নিয়ে দরবার শরিফে প্রবেশ করে।
তারা দরবারের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। সেখানে রাজীব মিস্ত্রিসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা দরবার শরিফের দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করে জোবায়ের নামের একজনকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে। এরপর রাজীব লোহার রড দিয়ে আব্দুর রহমানের কোমর বরাবর এবং হত্যার উদ্দেশে মাথায় আঘাত করেন।
বাদী লেখেন, আসামিরা এরপর আব্দুর রহমানকে হত্যার উদ্দেশে এলোপাতাড়ি ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা, ডান চোয়াল, ঠোঁট, থুতনি, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। সেই সঙ্গে এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করা হয়।
আব্দুর রহমানের চিৎকারে দরবার শরিফের পরিচারিকা জামিরন দৌড়ে এগিয়ে গেলে ৩ নম্বর আসামি আসাদুজ্জামান তাকেও হত্যার উদ্দেশে মাথায় কোপ মারেন বলেও লেখা হয় এজাহারে। কোপটি বাঁ হাত দিয়ে ঠেকালে কবজির ওপরের অংশের মাংস কেটে তিনি জখম হন।
আসামিরা দরবার শরীফের স্টিলের আলমারি ভেঙে ১০ লাখ টাকা এবং ৪ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে বলেও অভিযোগ করেছেন পীর আব্দুর রহমানের ভাই। এই ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ২০ লাখ টাকার মতো, বলা হয় এজাহারে।
হত্যার ঘটনায় ১৪ এপ্রিল রাতে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াত গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দীন ও সেক্রেটারি আবদুল্লাহ আল নোমানের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফিলিপনগরের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ নয়। এমনকি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আকস্মিকভাবে ঘটেছে।
এটি রাজনৈতিক কোনো পরিকল্পনার অংশ নয়। তবু বিষয়টি একটি রাজনৈতিক মহলের ইন্ধনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী জড়িত নেই বলে জানানো হয়।


