‘একটা পর্যায়ে শাহবাগ থেকে গণভবনের দিকে রওনা দিলাম। সবাই আমাদের রিকশা ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে থাকা অবস্থায় ফোনে খবর পেলাম, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন’, চূড়ান্ত বিজয়ের শেষ দিনগুলোর কথা এভাবে স্মৃতিচারণায় বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শীর্ষক গ্রন্থে অভ্যুত্থানের দিনলিপি তুলে ধরেছেন সজিব ভূঁইয়া। গত মার্চে প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত বইয়ে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ নামক পর্বে প্রথম অংশে তিনি তুলে ধরেন উত্তাল দিনগুলোর কথা।

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘মুশফিকুল ফজল আনসারীর পরিচিত আশিক খবরটা দিলেন। বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করলাম। ডয়চে ভেলের সাংবাদিক হারুন উর রশীদ স্বপন ফোন করে যখন প্রশ্ন করলেন, ‘শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, আপনাদের মন্তব্য কী?’ তখন নিশ্চিত হলাম, শেখ হাসিনা সত্যিই পালিয়ে গেছেন। এরপর নানা জায়গা থেকে বন্যার মতো ফোন আসতে লাগল। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও যোগাযোগ করা হচ্ছিল। তারা বলল, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বসতে চায়। আমাদেরও খোঁজা হচ্ছে। আমি বললাম, “আমরা ক্যান্টনমেন্টে যাব না। দেশের ভাগ্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে নয়, নির্ধারিত হবে জনতার মঞ্চ থেকে।”
‘সংসদ ভবনে যাওয়ার পথে রিকশায় বসেই আমি আর নাহিদ ভাই ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম, “অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-নাগরিকের প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এর বাইরে কোনো সরকার মেনে নেওয়া হবে না। ফ্যাসিস্ট খুনিদের বিচার বাংলার মাটিতে করা হবে, পালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। সন্ধ্যার মধ্যেই নিরপরাধ ব্যক্তি, রাজবন্দী ও গুমকৃত ব্যক্তিদের মুক্ত করা হবে। শুধু হাসিনা সরকারের পদত্যাগ নয়, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ করে নতুন বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণ করা হবে। চূড়ান্ত বিজয় ছাড়া কেউ রাজপথ ছাড়বেন না। বার্তা প্রেরক-আসিফ মাহমুদ ও নাহিদ ইসলাম, সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মিছিলের বড় অংশটা সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে ঢুকল। আরেকটা অংশ গেল গণভবনের দিকে। খবর এল, মানুষ গণভবনে ঢুকে পড়েছে, গণভবন দখল হয়ে গেছে। সংসদ ভবন এলাকায় অনেক মানুষের মধ্যে পড়ে গেলাম। সংসদ ভবনের সামনের সিডিতে দাঁড়িয়ে আমি আর নাহিদ ভাই বক্তব্য দিলাম। পাঁচ-ছয় হাজার মানুষ আমাদের বক্তব্য শুনল।’
‘সেখানে আমি, নাহিদ ভাই আর বাকের ছাড়া আরও ছিলেন আরিফুল ইসলাম আদীব ও তারিকুল ইসলাম। আমরা ভাবছিলাম, এরপর কী? জনগণ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নানা ধরনের কথা ছড়াচ্ছিল। মানুষ বিভ্রান্ত। সংসদ ভবনের সামনে থেকে আগুনের ধোঁয়া উঠছিল। বিধ্বস্ত অবস্থা। আকাশে কয়েকটা উড়ন্ত হেলিকপ্টার।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ভাবলাম, এমন বিভ্রান্তিকর অবস্থায় আমাদের দিক থেকে একটা বক্তব্য যাওয়া উচিত। আমরা কারওয়ান বাজারে বার্তা সংস্থা এএফপির কার্যালয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সংসদ ভবন এলাকা থেকে বের হওয়া ছিল কঠিন।’
‘আমাদের পেয়ে লোকজন আনন্দ উদ্যাপন করছিল। কোনোভাবেই আমাদের ছাড়ছিল না। জনসমুদ্রের কারণে রাস্তা দিয়ে এগোনো কঠিন হয়ে পড়েছিল। কেউ একজন একটা সিএনজি নিয়ে এল। সিএনজিতে করে কারওয়ান বাজারে এএফপির কার্যালয়ে যাওয়ার পথে ফার্মগেটে যানজটে আটকে যাই। অগত্যা নেমে হেঁটে এগোতে থাকি। চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয় থেকে সাংবাদিক জুমাতুল বিদা এ সময় ফোন করলেন। বললাম, “আমরা এএফপিতে যাচ্ছি।” তিনি চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরে যেতে বললেন। তখনো পর্যন্ত এএফপির ব্যুরোপ্রধান শফিকুল আলমের (বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব) সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আরিফুল ইসলাম আদীব বললেন, “তাহলে চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরেই যাই।” আমরা তেজগাঁওয়ে চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয়েই যাই। কেউ যাতে না চিনতে পারে, সে জন্য আমরা মাস্ক আর ক্যাপ পরে চলাফেরা করছিলাম। কারণ চিনতে পারলেই লোকজন উল্লাস করতে শুরু করে দিত। সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।’
‘খবর পেলাম, বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছেন। সেখানে ক্ষমতা পালাবদলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হচ্ছে। মনে হয়েছিল, এমন একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সব সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদেরা ঠিক কাজ করছেন না। ব্যাপারটা আমাদের ভালো লাগেনি। অনেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ বলেন, “যারা সেখানে যাবেন, তাদের জাতীয় বেইমান ঘোষণা করা হোক।” আমরা বললাম, এখন এসবের দরকার নেই, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। কীভাবে কী হবে, সরকার গঠিত হবে, তার রূপরেখা তৈরি করে আমরা একটা সংবাদ সম্মেলনের পরিকল্পনা করলাম।’

ক্ষমতার পালাবদলের প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরে গিয়ে শুনলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছেন। শুনে আমার মনটা খুবই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহকে ফোন করে বললাম, “ক্যান্টনমেন্টে গেলে আপনাদেরও জাতীয় বেইমান ঘোষণা করা হবে।” হাসনাত ও সারজিস তখন সেনাবাহিনীর গাড়ি থেকে নেমে চলে আসেন। তারাও চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয়ে চলে এলেন।’
‘জনতার মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেওয়ার অভিপ্রায়ে প্রথমে আমরা কারওয়ান বাজার মোড়ে সার্ক ফোয়ারায় সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছিলাম। এর মধ্যে নানা ধরনের গুজব শোনা যাচ্ছিল। যেমন, অনেক বিশ্বাসযোগ্য জায়গা থেকে খবর পাই যে ক্যান্টনমেন্টে না যাওয়ায় আমাদের গ্রেপ্তার করে সরকার গঠন করা হবে। সম্মিলিতভাবে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে এ রকম খোলা জায়গায় যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের গুলি করা হতে পারে, তুলেও নিয়ে যাওয়া হতে পারে। সার্ক ফোয়ারার পরিবর্তে আমরা চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয়েই সংবাদ সম্মেলন করলাম।’
‘সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয়ে একটা ছোট সভাকক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমানের সঙ্গে একটা ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। মানবজমিন পত্রিকার সাংবাদিক এহসান মাহসুদ এবং আমাদের পক্ষ থেকে আরিফুল ইসলাম আদীবই মূলত ওই বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। সে বৈঠকে আমি, নাহিদ ভাই, মাহফুজ ভাই ও নাসির ভাই ছিলাম। তারেক রহমানকে আমরা অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্থান দিই এবং বিএনপিকে সেই সরকারে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই। আমাদের প্রস্তাব ছিল জাতীয় সরকারে ৫০ শতাংশ রাজনৈতিক দলের এবং ৫০ শতাংশ সুশীলসমাজ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি থাকবেন। তারেক রহমান বললেন, তাঁরা এ ধরনের কিছুর অংশ হতে চান না। আমরা আমাদের সংস্কারের ভাবনাগুলো বললাম। তিনি সরাসরি বললেন, “এত বেশি দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তো মনে হয় না। আপনারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে একটা নির্বাচন দিয়ে দিতে পারেন।”
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তারেক রহমান প্রস্তাব দিলেন একজন প্রধান উপদেষ্টা রেখে সাতজনের একটা সরকার গঠন করে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া যেতে পারে। তাকে বললাম, আমরা জাতীয় সরকারই গঠন করতে চাই। বিএনপি সরকারে এলে সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। তারেক রহমান সাতজনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারেক রহমানকে আমরা জানালাম যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে।’
‘কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকটা শেষ হয়। পরে এহসান মাহমুদ আর আরিফুল ইসলাম আদীবকে কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরে বললাম, আমাদের পরামর্শ না নিয়ে তারা কেন এমন একটা বৈঠকের আয়োজন করলেন। আমরা বিএনপির মনোভাব বুঝে গেলাম। তারা জাতীয় সরকারে আসবে না। বিএনপিকে ছাড়া সরকার গঠন করলে বিষয়টা এক-এগারো বা মাইনাস টুর দিকে চলে যেতে পার বলে আশঙ্কা হলো। জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।’
‘৬ আগস্ট মাহফুজ ভাই জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। বিএনপি আসছে না বলে সেখানেও আলাপটা থেমে যায়। এরপর আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় সরকারের বিষয়ে আলোচনা হয়নি।’
‘সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলা হলো। আমরা স্পষ্টভাবে বললাম, কোনো সেনাশাসন মেনে নেওয়া হবে না। আমরা ওয়ার্ডভিত্তিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা কমিটি গঠনের ঘোষণা দিলাম।’
‘এই সংবাদ সম্মেলনের আগে চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের কার্যালয়ে বসেই আবদুল হান্নান মাসউদ আরেকটা সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘুদের হামলার প্রতিবাদ জানায়। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কারণে হামলার শিকার হচ্ছিলেন। হামলা যতটা হয়েছিল, গুজব ছড়িয়ে চেয়েও বেশি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার প্রচারও হতে থাকে মাসউদের সংবাদ সম্মেলনটা জরুরি ছিল’… যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।


