ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও জুলাই জাতীয় সনদবাস্তবায়নে গণভোট শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে ওই আসন বাদে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ চলছে, যা বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা চলবে।
নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। তারমধ্যে দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, তাদের প্রার্থী সংখ্যা ২৯১ জন। নিবন্ধিত ১০টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে নেই। আরও আটটি নিবন্ধিত দলওনির্বাচন থেকে দূরে রয়েছে।
দেশের মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ। ত্রয়োদশজাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দেশের ২৯৯টি আসনের ১২ কোটি৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার ভোট দেবেন।

এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারীভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গেরভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। ৩০০ আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটারঝালকাঠি-১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ভোটারগাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। ঢাকা-১২ আসনেসবচেয়ে বেশি ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আর পিরোজপুর-১ আসনে সবচেয়ে কম ২ জন প্রার্থী রয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। পোস্টাল ভোট বিডিমোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী (ওসিভি) ও দেশের অভ্যন্তরে(আইসিপিভি) মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধনকরেন। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং দেশেরঅভ্যন্তরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, সকাল পর্যন্ত দেশের ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৬৫ জনএবং ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫ জন প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোটদিয়েছেন।
নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকমিশন দেশের অর্ধেক ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ কারণে দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, প্রায় ৯ লাখ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
মোতায়েন করা সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য, ৫টি জেলার ১৭টি আসনে ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৫০০ বিমানবাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার৪৫৩ বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ কোস্টগার্ড সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ র্যাব সদস্য, বিএনসিসির ১২৮টি সেকশনের ১ হাজার ৯২২ সদস্যএবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ ফায়ার সার্ভিস সদস্য।
নিরাপত্তা জোরদারে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য বডি–ওর্ন ক্যামেরাসহ দায়িত্ব পালন করছেন এবং ৫০০–এর বেশি ড্রোন ব্যবহারকরা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ইউএভি, ড্রোন ও বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৪২ হাজার৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার রয়েছেন। পোস্টাল ভোটে দায়িত্বে আছেন প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা।
এ ছাড়া ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ভোটের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও পরের দুই দিনসহ মোট পাঁচ দিন (১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি) দায়িত্ব পালন করবেন। আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রতি উপজেলা ও থানায় ন্যূনতম দুইজন করে মোট ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন।
নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকদায়িত্ব পালন করছেন—এর মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে। এ ছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাথেকে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এসেছেন। এদের মধ্যেপ্রায় ৬০ জন বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি, প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায়১৫০ জন সাংবাদিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন, এএনএফআরএফএল-এর ২৮ জন, কমনওয়েলথের ২৫ জন, আইআরআই-এর ১২ জন এবং অন্যান্য সংস্থার প্রায় ৩০ জনপর্যবেক্ষক রয়েছেন। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ সাংবাদিক নিবন্ধিত হয়েছেন।

মনোনয়নপত্র জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি (দলীয় ২ হাজার ৮৭, স্বতন্ত্র৪৮১)। বাছাইয়ে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ ও ৭২৬টি বাতিল হয়। আপিলে৪২৫ জন প্রার্থিতা ফেরত পান এবং ৩০৭ জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহারকরেন। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন জমা ২৯ ডিসেম্বর, বাছাই ৩০ ডিসেম্বর–৪ জানুয়ারি, প্রত্যাহার ২০ জানুয়ারি, প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি এবং প্রচার ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে৭টা পর্যন্ত চলে।
ভোটগ্রহণের দিনকে কেন্দ্র করে যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপকরা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকবে। ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্তমোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটেরব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে এবং অধিকাংশ আসনের ফলমধ্যরাতের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে ইসি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীসরকার শপথ নেয়। শুরুতে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি ওঠে। গতবছরের ৬ জুন প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধেনির্বাচন হবে। পরে ১৩ জুন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনে ঐকমত্য হয়। ১৩ নভেম্বর ঘোষণা দেওয়া হয়—জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে হবে। ২১ নভেম্বর এ এম এম নাসিরউদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়—এটাই তাদের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
এর আগে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। ২৯৯ আসনে ১১ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৫৭ ভোটার ছিল। ভোটপড়ে ৫ কোটি ৩০ হাজার ১২২টি (৪১.৮ শতাংশ)। মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৬৯ জন। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে নির্বাচনবিতর্কিত হয় এবং ‘আমি–ডামি’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।
একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। গড়ে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানানো হয়। সহিংসতায় ১৪ জন নিহত হনএবং ১৬টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়। আওয়ামী লীগ ২৫৯টি আসনে জয়ী হয়ে মহাজোটসহ ২৮৮ আসন পায়। নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ নামে আলোচিত হয়।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ৫ জানুয়ারি ২০১৪। ১৫৩ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, ১৪৬ আসনে ভোট হয়। ভোট পড়ে ৪০দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের আগের সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—১৯৭৩ সালে ভোটের হার ছিল ৫৫ শতাংশ, ১৯৭৯ সালে ৫১ দশমিক ১২ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে ৫৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ১৯৮৮ সালে ৫৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ফেব্রুয়ারি১৯৯৬-এ ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, জুন ১৯৯৬-এ ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ২০০১ সালে ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ২০০৮ সালে ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৪০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনকে সময় ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিনিয়ন্ত্রণ—এই দুই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা করছে কমিশন।


