গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের কঠোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছেন তিনি। বুধবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে হঠাৎ করেই তিনি এসব ঘোষণা দেন।
ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ডেনমার্কের অধীনে থাকা স্বায়ত্তশাসিত আর্কটিক অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না এবং আপাতত ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও প্রত্যাহার করা হচ্ছে।’
ট্রাম্প জানান, তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে হওয়া চুক্তির আভাস। ওই বৈঠকের পরই ট্রাম্পের সুর অনেকটা নরম হয়ে আসে।
তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ও পুরো আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এটি এমন একটি চুক্তি যা নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রশ্নে সবার জন্যই লাভজনক হবে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে সহায়ক হবে। এটি একটি “চিরস্থায়ী চুক্তি” হতে যাচ্ছে।’
অবশ্য বৈঠক শেষে রুটে জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে থাকবে কি না- এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। বরং আলোচনার মূল বিষয় ছিল- আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশগত নিত্য নতুন ঝুঁকি এবং চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান তৎপরতা।
ন্যাটোর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, শিগগিরই ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে। সবার লক্ষ্য- গ্রিনল্যান্ডে যেন রাশিয়া বা চীন কখনোই অর্থনৈতিক কিংবা সামরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, তার পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই আলোচনায় যুক্ত থাকবেন।

সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধা দেওয়া হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। এমনকি তার প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না দেওয়া পর্যন্ত সে শুল্ক ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ানোরও হুমকি দেন তিনি। এতে নতুন করে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কায় ন্যাটো জোটসহ গোটা ইউরোপে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ন্যাটোর মতো শক্তিশালী সামরিক জোটেও ভাঙনের শঙ্কা জানান কূটনৈতিক বোদ্ধারা। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসেন জোটের মহাসচিব। ধারণা করা হচ্ছে- গ্রিনল্যান্ডের দখল বিষয়ে ট্রাম্পকে তিনি যথেষ্ট আশ্বস্ত করতে পেরেছেন বলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প স্বীকার করেন, তার আগের হুমকিতে বিশ্বের আর্থিক বাজার অস্বস্তিতে পড়েছিল। তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র শক্তি ব্যবহার করতে পারে, তবে সামরিক পথ আমি কখনোই পছন্দ করি না।’
তবে একই বক্তৃতায় ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি তীব্র ক্ষোভ জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া পরিবেশনীতি, অভিবাসন, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ইউরোপের সক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ করেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, কানাডা এবং ন্যাটোর দিকেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
ডেনমার্ককে তিনি ‘অকৃতজ্ঞ’ আখ্যা দিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে ‘এক টুকরো বরফের’ সঙ্গে তুলনা করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো দেশ এই অঞ্চল সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম নয়। তবে বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই বক্তৃতার সময়ও উঠে আসে ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা। কয়েকবার ভুল করে গ্রিনল্যান্ডকে ‘আইসল্যান্ড’ বলে সবার হাসি ও বিদ্রুপের পাত্র হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অন্যদিকে, ডেনমার্ক সরকার জানিয়েছে, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে নয়, বরং কূটনৈতিক পথেই সমাধান হওয়া উচিত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, ‘ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার—এই তিনটি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই সমাধান আসতে হবে।’


