সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া সত্ত্বেও থামছে না মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির মতো ঘটনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ‘মব কালচার’ সমাজে স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন সরকার দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল। তবে বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক কিছু সহিংস ঘটনা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা এই ইস্যুটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা শিথিলতার সুযোগে এ ধরনের প্রবণতা বেড়েছে, যা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরণকালীন সময়ে অস্বাভাবিক নয়।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’এর পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান বলেন, বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারব্যবস্থা দুর্বল মনে হলে এ ধরনের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। পরিস্থিতি উত্তরণে জনগণের আস্থা ফেরাতে ফৌজদারি বিচার কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সুরে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় এই সংহিসতা মোকাবিলায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে এখন যেহেতু একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে, তাই জনমনে স্বস্তি ফেরাতে তাদের আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে সরকার নতুন আইন বা অস্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। এ ছাড়া যে এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, সেখানকার পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রস্তাব করেন তিনি। সেই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগে প্রচারণার কথাও জানান শিহাব উদ্দিন খান।
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে কোনোভাবেই ‘মব কালচার’ বরদাশত করা হবে না। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরও দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। তবে প্রশাসনের এমন কড়া বার্তার পরও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে ৪২টি মব ভায়োলেন্সের ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে এসব হামলা চালানো হয়। একই মাসে অন্তত ৬৩ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে আহত হয়েছেন ৫৫ জন।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, জানুয়ারি মাসে ২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ডিসেম্বরে এমন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১০ জন। অর্থাৎ পরিসংখ্যান বলছে, মাস গড়ানোর সাথে সাথে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চুরির অপবাদে তিন নারীকে গাছে বেঁধে চুল কেটে দিয়ে নির্যাতন করা হয়। যদিও ভুক্তভোগী নারীরা দাবি করেছেন, তারা সেখানে কাজের খোঁজে গিয়েছিলেন। একইভাবে রাজশাহীর পুঠিয়ায় ডাকাতির সন্দেহে আটজনকে গণপিটুনি দেওয়া হলে একজন মারা যান।
ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় আফরা ইবনাত খান ইকরা নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পর অভিনেতা জাহের আলভী মব ভায়োলেন্সের আশঙ্কায় দেশ ফিরতে ভয় পাচ্ছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন। যদিও প্রশাসন এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি মব ভায়োলেন্সের কোনো যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত করেনি।
রাস্তায় সহিংসতার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ‘মব’ স্টাইলে চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকেও একটি নির্দিষ্ট পক্ষ এমডির কক্ষে ঢুকে কর্মকর্তাদের বদলির জন্য অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, যাকে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা ‘মব বিহেভিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরণকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ পায়। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনের শাসন সমুন্নত রাখা। অপরাধীদের দ্রুত বিচার, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের সক্রিয়তাই বলে দেবে এই সহিংসতা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দেবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


