দেশের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মহানন্দা নদীর তীরবর্তী ছয়টি গ্রামে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ পানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে দিন পার করছেন।
শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ টিউবওয়েলগুলো অচল হয়ে পড়েছে। এতে দৈনন্দিন কাজ ও খাওয়ার পানির জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, গত সাত বছর ধরে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বছরের মাত্র তিন থেকে চার মাস বাড়ির টিউবওয়েলগুলোতে পানি পাওয়া যায়। বাকি সময়টা পুরোপুরি পানিশূন্য থাকে। ফলে সিদ্দিকনগর, মোমিনপাড়া, সাহেবজোত, ঈদগাবস্তী ও পুরাতন বাজারসহ অন্তত ছয়টি গ্রামের মানুষ সীমান্তের শূন্য রেখায় মহানন্দা নদীর পাশে অবস্থিত সরকারি একটি মাত্র নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, তপ্ত রোদের মধ্যে নদীর পাড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ বালতি হাতে ছুটছেন, আবার কেউ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পালার অপেক্ষা করছেন। অনেকে কাঁধে ভার নিয়ে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এই পানির লড়াই দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের প্রাত্যহিক কাজকর্মেও বড় ধরণের ব্যাঘাত ঘটছে।
সিদ্দিকনগর এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, পানির জন্য তাদের দীর্ঘ দিন ধরে কষ্ট সইতে হচ্ছে। এই সমস্যার কথা তারা বারবার স্থানীয় প্রশাসন, চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের জানিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত সংকট সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
একই গ্রামের বাসিন্দা নুর নেহার জানান, তাদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে নিজস্ব টিউবওয়েল আছে। কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেগুলো থেকে এক ফোঁটা পানিও উঠছে না। সাধারণ মানুষ আর কতদিন এভাবে কষ্ট করবে সেই প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারিভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গৃহিনী জাহানারা বেগম জানান, বর্তমানে সাধারণ টিউবওয়েলের পাশাপাশি পাম্প বসিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। যারা অনেক গভীরে বোরিং করে মোটর বসিয়েছেন তারা সামান্য পানি পাচ্ছেন। কিন্তু অন্যের বাড়ি থেকে পানি আনতে গেলেও নানা রকম বিপাকে পড়তে হয়। পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় তাদের রান্নাবান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, নদীতে পানি কমে যাওয়া এবং সমতল ভূমি খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কৃষি জমিতে ভারী সেচ পাম্প স্থাপনের ফলে পানির স্বাভাবিক স্তর নিচে নেমে গেছে। এই দুর্ভোগ নিরসনে কমিউনিটি ভিত্তিক সাবমার্সিবল পাম্প অথবা ‘তারা পাম্প’ স্থাপনের সুপারিশ ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, ওই এলাকার পানি সংকটের বিষয়টি প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। স্থানীয়দের চাহিদা অনুযায়ী সাবমার্সিবল এবং তারা পাম্পের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুতই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।


