দ্বিতীয় দিনের মত চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ডাকা ধর্মঘট। এদিনও হাসপাতালে আসা রোগীদের এ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, হাসপাতাল চত্বরে পার্কিং ব্যবস্থার দাবির আড়ালে আসলে রোগীদের জন্য ‘অ্যাপ ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ চালু করতে চায়ছে মালিক সমিতি, এতে রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স সেবা পেতে বাড়তি ভাড়া গুণতে হতে পারে। মাসে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার উৎস এই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা যুবদলের নামধারি ইমন-বাদল সিন্ডিকেট।
সরেজমিন বুধবার সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
জরুরি বিভাগের সামনে সীমা আক্তার নামে এক রোগীর ভাই রেজাউল করিম অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কথা হয় তার সঙ্গে। রেজাউল বলেন, ‘গতকাল মাওয়া রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আমার বোন। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন এখানকার চিকিৎসকরা। তবে ২-৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অ্যাম্বুলেন্স জোগার করতে পারিনি। ৯৯৯ এ কল করেছিলাম। তবুও পাইনি। শেষে জরুরি বিভাগের সামনে থাকা ঢাকা মেডিকেলের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আমাদের বলেন, তিনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে দিয়ে আসতে পারবেন। এরপর সেই গাড়িতে করেই এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি।’
সাভার থেকে আসা ব্রেইন স্টোকের রোগী শাহীন গাজীকে জরুরি বিভাগের সিঁড়ির ওপর ট্রলিতে শুয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় । তার ছোট ভাই শামীম গাজি বলেন, ‘এমআরআই করার জন্য লালবাগ ইবনে সিনা হাসপাতালে যেতে হবে। তবে আধাঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে পাচ্ছি না।’
শফিক আহমেদ নামে একজন বলেন, ‘পুরো হাসপাতালটিই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে। অ্যাম্বুলেন্সও তার বাইরে না। এখানে বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসব রোগী নিয়ে যেতে, সেটিও করতে পারছি না। এখানকার চালকেরা বাধা দিচ্ছে। রোগীদেরকে জিম্মি করে তারা আন্দোলন করছে। সরকারের উচিৎ, তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।’
এর আগে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিতে মঙ্গলবার থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন।
ঢাকা মেডিকেল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির এক সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, হাসপাতালের বিগত পরিচালক রোগীদের সুবিধার জন্য অ্যাপ ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করেছিলেন। তবে মালিক সমিতির সিন্ডিকেট মিলে সেই অ্যাপে ভাড়ার মূল্য তালিকা অনেক বেশি করেছিল। এক হাজার টাকার ভাড়া অ্যাপের দোহাই দিয়ে ২৫০০ টাকা আদায় করা হতো। আর আট হাজার টাকার ভাড়া আদায় করা হতো ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, সেই অ্যাপ থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতিসহ কয়েকটি সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট একটি কমিশন আদায় করত। যার পরিমাণ ছিল দিন প্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। যা মাসে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়াত। হাসপাতালে নতুন পরিচালক আসার পর সেই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছেন। এজন্য সিন্ডিকেটের টাকাও বন্ধ হয়ে গেছে।
আরেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক বলেন, ‘হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিটি মূলত এদের আইওয়াশ। মূল দাবিটি সেই গলাকাটা ভাড়া আদায়ের অ্যাপ ভিত্তিক এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা। এখন হাসপাতালের ভিতরে পার্কিং করতে পারলেইতো পরে আবার অ্যাপ চালু করতে পারবে। তাই এত পাঁয়তারা করছে তারা। তবে তারা রাজনৈতিক পদধারী। এজন্য যেসব অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা এই দাবি-দাওয়ার বিপক্ষে, তারা কোনো প্রতিবাদ বা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিতে পারছে না। এই ধর্মঘট কর্মসূচির সব খরচ সব সেই অ্যাপ কোম্পানির লোকজন বহন করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ধর্মঘট কর্মসূচির মূলে রয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমন আলী। বাদল ঢাকা মেডিকেল ইউনিট যুবদলের সভাপতি ও ইমন সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী। অ্যাপ ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে পাওয়া মাসিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারাও তারাই করতেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমন আলী বলেন, ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট চলমান রয়েছে। আজকে যদি আমাদের দাবি মেনে না নেয়, তবে আগামীকাল থেকে ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্সের মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হবে।’


