বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সম্পর্কের এই ‘পুনর্মূল্যায়নের’ অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আগামী ৯ এপ্রিল দিল্লি থেকে মরিশাসগামী একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে একই সঙ্গে যাত্রা করবেন। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার এয়ার মরিশাসের সেই ফ্লাইটে সাত থেকে আট ঘণ্টার এই দীর্ঘ যাত্রাকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে দুই দেশের মন্ত্রী একান্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করার সুযোগ পাবেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই উচ্চপর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকার গঠনের পর এটিই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক ভারত সফর। তিনি মঙ্গলবার ভারতের রাজধানীতে পৌঁছাবেন। যদিও তিনি ভারতের মাটিতে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় অবস্থান করবেন, তবে মরিশাসে অনুষ্ঠেয় নবম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য এই যৌথ বিমানযাত্রা পুরো সফরটিকে কার্যত পাঁচ দিনের এক দীর্ঘ কূটনৈতিক মিশনে রূপ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের শীতলতা কাটিয়ে দুই দেশই এখন সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করছে।
পারস্পরিক সমঝোতার মিশন
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই সফরকে একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতার মিশন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশই এখন সম্পর্কের গতিপথ ঠিক করতে চাইছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। দুই দশক আগের বিএনপি সরকারের মতো বর্তমান সরকারে জামায়াতে ইসলামী অংশীদার হিসেবে নেই। বরং তারা এখন প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সফরের প্রস্তুতি নিতে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ গত ৫ এপ্রিল সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর শেষে পুনরায় দিল্লি ফিরে গেছেন। ভারত এই সফরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা স্পষ্ট, যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে কি না তা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
ঢাকার এজেন্ডা: পানি, সীমান্ত ও বাণিজ্য
আগামী ৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। এছাড়া ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গেও একটি আলাদা বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি গুরুত্ব পাবে। এগুলো হলো—সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা এবং স্থগিত হওয়া বাণিজ্যিক সুবিধাসমূহ পুনরায় চালু করা। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য দিল্লি বিমানবন্দরে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ হওয়ায় রপ্তানিকারকরা বর্তমানে দুবাই বা মালদ্বীপ হয়ে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন, যা অনেক ব্যয়বহুল। এছাড়া স্থলবন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্য স্থবির হয়ে থাকায় রপ্তানিকারকদের মুম্বাইয়ের নাভা শেভা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ঢাকা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাইবে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির বিষয়েও আলোচনা হবে।
দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি: কানেক্টিভিটি ও নিরাপত্তা
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর মনে করেন, দুই দেশই এখন বুঝতে পেরেছে যে সম্পর্কের এই দূরত্ব কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। তবে ভারত সুবিধাগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রত্যাশার কথাও জানাবে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগরতলা-আখাউড়া রেল লিঙ্কের মতো থমকে যাওয়া কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করার জন্য চাপ দেবে দিল্লি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে ভারত তাদের কঠোর অবস্থানে অনড় থাকবে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অধিকারকে ভারত স্বীকৃতি দিলেও কৌশলগত কোনো সুবিধা যাতে ইসলামাবাদ না পায়, সে বিষয়ে ঢাকা থেকে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চাইবে দিল্লি।
বিমসটেক না কি সার্ক?
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত চাইছে ঢাকা যেন সার্কের পরিবর্তে বিমসটেক’কে বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে সহ অনেক ভারতীয় পর্যবেক্ষক মনে করেন, গত এক বছর বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ কোনো সভা না ডাকায় দিল্লি কিছুটা অসন্তুষ্ট। অন্তর্বর্তী সরকারের সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টাকে ভারত সতর্কতার সঙ্গে দেখেছে। তাই বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাকি এক বছর বাংলাদেশ যেন সক্রিয় ভূমিকা রাখে, সেই চাপ দিল্লির পক্ষ থেকে থাকতে পারে।
শীর্ষ পর্যায়ের সফরের ইঙ্গিত
মরিশাসের এই সম্মেলনটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিজেপি নেতা রাম মাধবের নেতৃত্বাধীন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে আয়োজন করছে। খলিলুর রহমানের এই সফরটি মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের একটি প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ গন্তব্য ভারত হবে কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে দিল্লি ও মরিশাসের মধ্যকার মাঝ আকাশে কাটানো ওই সাত ঘণ্টা সময় দুই দেশের ভবিষ্যতের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে। শীতকালীন কূটনৈতিক জড়তা কাটিয়ে ঢাকা ও দিল্লি এখন একে অপরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।


