চট্টগ্রামে বর্ষা শুরু হতেই এডিস মশার লার্ভা ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ অনুযায়ী, নগরের প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে মিলছে এডিস মশার লার্ভা।
গত তিন বছরে মশক নিধনে ২২ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ, ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, জরিমানা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ও মানবিক সংস্থা মেডিসিন্স সান্স ফ্রন্টিয়ার্সের (এমএসএফ) সহায়তা নিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এটি বাস্তব সমাধানের পথ নাকি দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা আড়াল করার নতুন কৌশল?
স্বাস্থ্য বিভাগের ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত নগরের ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপস্থিতি মিলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এর মধ্যে ৮টি ওয়ার্ডকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রেড জোনগুলো হলো উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাঁচলাইশ (ওয়ার্ড-০৩), জালালাবাদ (ওয়ার্ড-০২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ হালিশহর (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) ও আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)।
জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার শুরুতে এই হার অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত বহন করছে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জুলাই ও আগস্ট মাসেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। মৌসুমের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় এখনো সামনে থাকায় আগামী দুই মাসে সংক্রমণ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কার্যক্রম নিয়ে। ২০২৩ সালে মশক নিধনে ৫ কোটি, ২০২৪ সালে ৮ কোটি ও ২০২৫ সালে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট বরাদ্দ ২২ কোটির বেশি হলেও মাঠপর্যায়ে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল আসেনি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ব্যাপক বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। গত বছর চসিক এই খাতে খরচ করেছিল মাত্র ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
নগরবাসীর অভিযোগ, ফগিং কার্যক্রম ছিল অনিয়মিত, ওষুধ প্রয়োগ হয়েছে লোক দেখানোভাবে, ড্রেন-নালা পরিষ্কার কার্যক্রম ছিল সীমিত। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলাবদ্ধ এলাকাগুলো নিয়মিত তদারকির বাইরে থাকায় এডিস মশার মূল উৎস ধ্বংসে বড় ধরনের ব্যর্থতা ছিল।
জরিপ প্রতিবেদনে চার দফা জরুরি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেড জোন এলাকায় তাৎক্ষণিক বিশেষ অভিযান, লার্ভা ধ্বংসে নিবিড় তদারকি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চট্টগ্রামে এখন ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপই সক্রিয় রয়েছে। ফলে একজন ব্যক্তি একাধিকবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৩ জুন আন্তর্জাতিক সংস্থা মেডিসিন্স সান্স ফ্রন্টিয়ার্সের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমএসএফ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে চট্টগ্রামে কাজ করবে। সংস্থাটি রোগতত্ত্ববিদ, ডেটা অফিসার ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সরকারি হাসপাতাল ও দপ্তরে যুক্ত করবে। চুক্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি ও এমএসএফ-এর পক্ষে মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর ডা. কারমেঞ্জা গালভেজ সই করেন।
পৃথকভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) সঙ্গেও এ বিষয়ে বোঝাপড়া হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ডেঙ্গু মোকাবিলায় অতীতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে থাকা সমন্বয়হীনতা দূর করতে এক বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের সিভিল সার্জন কার্যালয় অফিস, সিটি করপোরেশন, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব হাসপাতালকে একটি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ একক কোনো সংস্থার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা শহরের সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে আমরা মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মান উন্নত করতে একসঙ্গে কাজ করব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।’
তবে চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানা জানান, এমএসএফ-এর সঙ্গে মূল চুক্তিটি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক করলেও চসিক একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর ভিত্তিতে কাজ করছে। ইতোমধ্যে এমএসএফ চসিকের চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দিলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ এখনো অস্পষ্ট।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর মূল মৌসুম সামনে রেখে আগামী ১ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় মিলিত হবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এমএসএফ-এর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু কার্যক্রমের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো আধুনিক তথ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা। সংস্থাটি লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব রোগতত্ত্ববিদ ও মেডিকেল ডেটা অফিসারদের সরাসরি সরকারি অফিসগুলোতে নিয়োগ দেবে। তারা ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করবেন শহরের কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে ও পরবর্তী হটস্পট কোথায় হতে পারে।
এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন সুনির্দিষ্ট এলাকায় আগেভাগেই মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে পারবে। মাঠপর্যায়ে মশার আচরণ ও নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ গবেষণাও করবে সংস্থাটি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলার বিদ্যমান কাঠামো পর্যাপ্ত ছিল না। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, মাঠপর্যায়ে দুর্বল মনিটরিং, নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা ও হাসপাতাল প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা মিলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া বিকল্প দেখছে না প্রশাসন।’


