দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এমন মুহূর্তে নির্বাচনী জালিয়াতি এবং ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ‘সতর্ক অবস্থান’ নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। নির্বাচনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রার্থী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে এই সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে।
রাজধানী ছাড়াও যশোর, সাতক্ষীরা, পাবনা এবং নড়াইল জেলার বিভিন্ন আসনে স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রভিত্তিক বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কিছু এলাকায় ‘কেন্দ্র দখল প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যারা নির্বাচনের আগের রাত থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত মোতায়েন থাকবে। যদিও এই পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তবে উভয় দলের নেতারাই নির্বাচন কমিশনের ওপর তাদের আস্থার কথা জানিয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা ‘প্রতিরোধ কমিটি’ শব্দটির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন, বরং তারা এগুলোকে কেবল সতর্কতামূলক প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, কেন্দ্র দখল বা নির্বাচনী কারচুপি রোধ করতেই এই বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন সংস্কার কমিটির সদস্য জেসমিন টুলি এই পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনে পারস্পরিক অভিযোগের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে নির্বাচন কমিশনকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে এই আশঙ্কাগুলো কোনোভাবেই সংঘাতের রূপ না নেয়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যালট পেপার ছিনতাই বা কেন্দ্র দখলের আশঙ্কা মাথায় রেখেই উভয় দল তাদের কৌশল সাজাচ্ছে। এমনকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যেও এক ধরনের পারস্পরিক অনাস্থার আভাস পাওয়া গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কমিটি গঠন করিনি। তবে কেউ যদি ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের অপকর্মের চেষ্টা করে, তবে আমাদের কর্মীরা তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত আছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখছি।’
অন্যদিকে, জামায়াত নেতারা বিভিন্ন কৌশলে ভোট কারচুপি বা কেন্দ্র দখলের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে তারা এই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো সংঘাতে জড়াতে চাই না। তবে কেউ যদি কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা করে বা ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়, তবে আমাদের কর্মীরা তাদের থামানোর জন্য প্রস্তুত থাকবে। এটি কোনো কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি নয়, বরং আমাদের কর্মীদের একটি সতর্ক প্রস্তুতি।’
সাধারণ ভোটাররা একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করছেন। তারা কোনো ভয় বা সংঘাত ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে শেষ মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে নজরদারি ও সতর্কতা বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এ ধরনের উদ্বেগ ও অভিযোগ নতুন না হলেও এবারের নির্বাচনে এর প্রবণতা অনেক বেশি প্রকট।
পাবনা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকার আট-নয়টি কেন্দ্রে কারচুপির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাদের কর্মীরা ওই কেন্দ্রগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।’
একইভাবে যশোরের জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান গোলাম কুদ্দুস বলেন, ‘যশোর জেলার কিছু কেন্দ্রে দখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেকোনো ধরনের জালিয়াতি বা কেন্দ্র দখল রুখতে আমরা স্থানীয়ভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করেছি।’
সব মিলিয়ে ভোটাররা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতীক্ষায় রয়েছেন এবং তারা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আশা করছেন।


