ঝিনাইদহ জেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বনে-জঙ্গলে অনাদরে-অবহেলায় বেড়ে ওঠে ভাটাম বা ভেটুল গাছ। কাঠের চাহিদা হিসেবে এই গাছের কোনো কদর নেই, মূলত জ্বালানি হিসেবেই এর ব্যবহার ছিল সীমাবদ্ধ।
প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মূল্যহীন এই গাছের কাঠ দিয়েই এখন তৈরি হচ্ছে আইসক্রিমের কাঠি। এতে একদিকে যেমন অবহেলিত এই গাছের কদর বেড়েছে, অন্যদিকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর শহরের দুধসরা গ্রামে সৃষ্টি হয়েছে নারী ও অসচ্ছল পরিবারগুলোর নতুন কর্মসংস্থান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুধসরা গ্রামে খালের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ছোট্ট কারখানা। কারখানার সামনে স্তূপ করে রাখা আছে বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ভাটাম বা ভেটুল গাছের গুঁড়ি, যা এলাকাভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। কারখানায় সারাদিন চলে কাঠি তৈরির কাজ। কাঠ থেকে বিশেষ উপায়ে কাঠি তৈরির পর তা রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। রোদে শুকানোর পর সেগুলো পাঠিয়া দেওয়া হয় গ্রামের বাড়ি বাড়িতে। গ্রামের নারীরা সংসারের নানা কাজ সামলে অবসর সময়ে এই কাঠি বাছাই ও বান্ডিল করার কাজ করেন। হাত দিয়ে নিখুঁতভাবে কাঠি বাছাইয়ের ফলে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানও চমৎকার হয়।
কারখানার প্রধান কারিগর মো. মোখলেসুর রহমার জানান, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও যশোর অঞ্চলের গাছ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাটাম গাছ সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবারের বয়স্ক নারী ও পুরুষ এই কাঠি বাছাই ও বান্ডিল তৈরির কাজে যুক্ত আছেন। এ কাজের মাধ্যমে একেকজন মাসে গড়ে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করছেন।
দুধসরা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন জানান, অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। ঘরে অসুস্থ স্বামী থাকায় বাইরে গিয়ে কাজ করা তার জন্য বেশ কঠিন। তাই গত প্রায় ২০ বছর ধরে ঘরে বসেই কাঠি বাঁধার কাজ করছেন, আর এই আয় দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা মিয়া জানান, গত ২৫ বছর ধরে গ্রামের নারীরা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। এই কারখানা চালু হওয়ার পর থেকে গ্রামের অনেক অসচ্ছল পরিবার দু’বেলা দুমুঠো খাওয়ার সংস্থান করতে পারছে। এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে ঘরে বসে এ কাজ করে বাড়তি আয় করছে।
আইসক্রিমের কাঠি তৈরি কারখানার ব্যবস্থাপক মীর শাহরিয়ার আহমেদ দীপু জানান, ২০০১ সালে তার বাবা প্রথম বাঁশ থেকে আইসক্রিমের কাঠি তৈরি করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাঁশের তৈরি কাঠির ওপর আইসক্রিম কোম্পানিগুলোর আপত্তি থাকায় তারা গাছের কাঠ দিয়ে কাঠি উৎপাদন শুরু করেন। ভাটাম বা ভেটুল গাছ বনে-জঙ্গলে এমনিতেই জন্ম নেয়, এর কোনো পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না। ফলে খুব কম দামে এবং সহজেই কাঁচামাল হিসেবে এই কাঠ পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে এই কাঠি তৈরি করা হয়।
তিনি আরও জানান, তাদের কারখানায় উৎপাদিত আইসক্রিমের কাঠি এখন দেশের বিভিন্ন জেলা ও বড় বড় আইসক্রিম কোম্পানিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত এই খাতটিকে আরও এগিয়ে নিতে এবং গ্রামের অসচ্ছল পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করতে সরকারি সহায়তার আবেদন জানান তিনি।


