নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় যাবেন। সেখানে অন্যান্য উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সুপারিশগুলো পেশ করবেন।
সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে বলে নিশ্চিত করেছে কয়েকটি সূত্র। আর এক্ষেত্রে গুরুত্ব পাচ্ছে সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের আদেশ ও দিনক্ষণ এবং পিআর পদ্ধতিতে আগামী সংসদে উচ্চ গঠন।
যদিও এ দুই ইস্যুতেই এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম মতবিরোধ রয়েছে।
ফলে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশই শেষ কথা নয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারে তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘সরকার ঘোষিত সময় আগামী বছরের ফেব্রুয়োরিতে নির্বাচন করতে চাইলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে ফের রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় নির্বাচনের উপর।’
সোমবার দিনভর গুঞ্জন ছিল, যেকোনো সময় সুপারিশ জমা দেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বিকাল ৪টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে কমিশনের সদস্যদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে সুপারিশ জমা দেxয়া হয়নি। বরং, খসড়া সুপারিশ পর্যালোচনা করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা এতে কোনো সংযোজন বা বিয়োজনও করেননি।
কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে প্রথমে একটি আদেশ জারি করা হবে। এই আদেশের ভিত্তি হবে ‘গণঅভ্যুত্থান’। যার নাম হবে ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’।
ওই আদেশে গণভোটের অধ্যাদেশও জারি করা হবে। যার ভিত্তিতেই হবে গণভোট। আর গণভোটে পাস হলেই আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা (সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জাতীয় সংসদ) পালনের ক্ষমতা দেওয়া হবে।
আদেশ জারির পর এর কিছু অংশ তাৎক্ষণিক এবং কিছু বিষয় পরবর্তী সময়ে কার্যকর হবে। আদেশের কোন ধারা কবে কার্যকর হবে, তাও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কমিশনের সুপারিশে।
তবে, গণভোটের সময় নিয়ে কমিশন কোনো সুপারিশ করেনি। বরং সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সরকারের ওপর।
কমিশনের বেশিরভাগ সদস্যই মনে করেন গণভোট আগে করতে গেলে নির্বাচন পেছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই গণভোট ও নির্বাচন একইদিন করার পক্ষে তারা। যদিও সরকারের পক্ষে যদি আয়োজন করা সম্ভব হয় তাহলে নির্বাচনের আগেও গণভোট দেওয়া যেতে পারে বলেও মত তাদের।
বিএনপি ও সমমনাদলগুলো জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের পক্ষে। আর জামায়াত ও সমমনারা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চায় জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট হোক।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক আদেশ জারি ও ওই আদেশের ওপর আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াত ও ৭টি দল মাঠের কর্মসূচিতে রয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোটে রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টের বিষয় উল্লেখ থাকবে না। ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, তার ওপরই গণভোট হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়িত হবে।
তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টের ব্যাপারে বিএনপি অনড়। তাদের মতে গণভোটে নোট অব ডিসেন্টের ব্যাপারগুলো উল্লেখ থাকতে হবে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ না রাখার ব্যাপারে মতামত দিয়েছে।
গণভোটে পাস হওয়া সংবিধান সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো আগামী সংসদকে অবশ্যই ২৭০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ সময় সংসদ নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ থাকবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ গণভোটে পাস হলে পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে উচ্চকক্ষ গঠন করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাধ্য থাকবে। পরিষদের অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী সংসদেই পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে উচ্চকক্ষ গঠন কার্যকরে বিশেষ শর্তটি রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রধান মতবিরোধই পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে। বিএনপি বাদে সংলাপে অংশ নেওয়া জামায়াত এনসিপিসহ ২৫টি দল উচ্চকক্ষে পিআর চায়। এটি নিয়ে গত চার মাসেও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি দলগুলো।
এখন পর্যন্ত জামায়াত, এনসিপিসহ কিছু দল গণভোট বাস্তবায়নের আদেশ এবং উচ্চ কক্ষে পিআর বাস্তবায়ন না হলে কঠোর আন্দোলনে নামতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত করা জনগণের কর্তৃত্বে আদেশ জারি করা হচ্ছে।’
তবে বিএনপি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ আদালতের মতামতে গঠিত। যার সংবিধান এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই।
অবশ্য জামায়াত এবং এনসিপি এই অবস্থানের বিরোধী।
দলদুটির দাবি, আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নন, আদেশ জারি করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নামে।
কমিশনের পক্ষ থেকে আদেশের সঙ্গে বিকল্প একটি প্রস্তাব দিতে পারে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে কমিশন সরকারকে গণভোট নিয়ে একটি বিল তৈরি করতে বলবে, যেখানে সনদের সংবিধান সংক্রান্ত সব প্রস্তাবগুলো থাকবে।
সেক্ষেত্রে সব প্রস্তাবকে সমন্বয় করে একটি আইন করতে হবে। যা গণভোটে যাবে। যদি সেটি পাস হয়ে যায় সেক্ষেত্রে ২৭০ দিন পরে পরিষদ পুরোটি বাস্তবায়ন না করতে পারলেও, আইনটি সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাবে।
অবশ্য কমিশনের এমন প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের সায় নেই বলেই জানা গেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পেতে শেষ সময়েও তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকৈ বৈঠক করেছে ঐকমত্য কমিশন। কিন্তু দলগুলোকে তাদের অবস্থান থেকে নড়ানো যায়নি।
অবস্থাদৃষ্টে মনে করা হচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে ফের দেশের রাজনীতির আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ হানা দিতে পারে।


