কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ এখন টেলিভিশনের পর্দায়। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বজুড়ে এই উন্মাদনা তৈরি হয়। ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল খেলা নয়, চরম নাটকীয়তা ও অবিস্মরণীয় মুহূর্তের এক বিশাল বৈশ্বিক উৎসব। আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে ফুটবল উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। ভক্তরা নিয়মিত সর্বশেষ খবরের খোঁজ রাখছেন। বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি, টিকিট বুকিং ও আয়োজক শহরগুলো নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। এবারই প্রথম ৪৮টি দেশ টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে খেলার সূচিতে কী বদল আসবে, তা জানতে সবাই উন্মুখ।
ফুটবল ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের আগে অতীতকে ফিরে দেখার এটাই উপযুক্ত সময়। আপনি বিশ্বকাপের খবর খোঁজা নিয়মিত ভক্ত হন, স্কুলের প্রজেক্টের ছাত্র কিংবা কুইজ প্রতিযোগিতার অনুরাগী— এই সুন্দর খেলার ইতিহাস বিস্ময়কর গল্পে ভরা। এক চালাক কুকুরের উদ্ধার করা খাঁটি সোনার ট্রফি থেকে শুরু করে খালি পায়ে গোল করার গল্পও এখানে রয়েছে। এসব তথ্য আপনাকে ফুটবল বিশেষজ্ঞ বানিয়ে দেবে।
বিশ্বকাপে ট্রফির নিয়ে রয়েছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিফার ভাইস প্রেসিডেন্ট ওত্তোরিনো বারাসি ট্রফিটি তার বিছানার নিচে সাধারণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। দখলদার সৈন্যরা নিরেট সোনার এই পুরস্কার চুরি করতে পারে ভেবে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন। তার এই চতুর কৌশল পুরো যুদ্ধ জুড়ে ট্রফিটি সুরক্ষিত রাখে। পরবর্তী সময় ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে প্রদর্শনী থেকে আসল ট্রফিটি চুরি হয়। এই ট্রফির নাম ছিল ‘জুল রিমে ট্রফি’। ব্যাপক পুলিশি তল্লাশিতেও তা মেলেনি। কয়েক দিন পর এক শ্রমিক তার পিকলস নামের কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। পিকলস বাগানের ঝোপের নিচে খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় হারানো ট্রফিটি খুঁজে পায়। পিকলস রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত হয়। তাকে আনুষ্ঠানিক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দেশ ব্রাজিল। তারা সর্বোচ্চ পাঁচবার এই শিরোপা জিতেছে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে মোট ১৬টি গোল করে শীর্ষে আছেন। কিংবদন্তি পেলে মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে প্রথম গোল করে কনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন। ইতিহাসের দ্রুততম গোলটি আসে ২০০২ সালে। ম্যাচ শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় তুরস্কের হাকান শুকুর গোলটি করেছিলেন। ট্রফি নিয়ে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে ১৯৬৬ সালে। তখন লন্ডনে আসল বিশ্বকাপ ট্রফিটি চুরি হয়। কয়েকদিন পর পিকলস নামের একটি কুকুর ঝোপের ভেতর থেকে এটি খুঁজে বের করে।
আজকের ফুটবল বিশ্বকাপকে বুঝতে আমাদের একদম শুরুতে ফিরে যেতে হবে। উদ্বোধনী টুর্নামেন্টটি ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানের মতো তখন বড় বাছাইপর্ব ছিল না। ইউরোপীয় দলগুলো জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে চায়নি। তাই মাত্র ১৩টি দল অংশ নেয়। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে উরুগুয়ে শিরোপা জেতে। সেই ম্যাচে কোন বল দিয়ে খেলা হবে, তা নিয়ে দুই দল একমত হতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল ও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল ব্যবহার করা হয়।
১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে ভারতের নাম প্রত্যাহারের ঘটনাটি বেশ আলোচিত। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী ফিফা খালি পায়ে খেলতে না দেওয়ায় ভারত অংশ নেয়নি। আসল কারণ ছিল ভ্রমণের অত্যধিক খরচ ও অলিম্পিককে দলের বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া। তবে বুট ছাড়া খেলার ঘটনা ঘটেছিল ১৯৩৮ সালে। ব্রাজিলের লিওনিদাস মাঠের বাইরে ঘন কাদায় বুট আটকে যাওয়ার পর পোল্যান্ডের বিপক্ষে খালি পায়ে এক দুর্দান্ত গোল করেছিলেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অল্প কয়েকটি দেশ বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তার করেছে। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে প্রতিটি টুর্নামেন্টে খেলা একমাত্র দেশ তারা। তাদের কখনও ঘরে বসে বিশ্বকাপ দেখতে হয়নি। জার্মানি ও ইতালি চারবার করে এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তিনবার এই শিরোপা জিতেছে। এছাড়া ফ্রান্স ও উরুগুয়ে জিতেছে দুইবার করে। একবার শিরোপা জেতা কঠিন হলেও তা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। এ পর্যন্ত মাত্র দুটি দেশ পরপর টুর্নামেন্ট জিতেছে। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিল এই কীর্তি গড়ে।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অনেক খেলোয়াড় রেকর্ড ভেঙে নিজেদের নাম অমর করেছেন। লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো আধুনিক ফুটবলাররা আলোচনায় থাকলেও জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক স্ট্রাইকার। চারটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে ১৬টি গোল করে তিনি ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদোকে ছাড়িয়ে যান। অন্যদিকে ফিফা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আইকন পেলে। তিনি কনিষ্ঠ গোলদাতাই নন, খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র ব্যক্তি। মাঠের সবচেয়ে প্রবীণ কিংবদন্তি মিশরের গোলরক্ষক ইসাম এল-হাদারি। তিনি প্রমাণ করেছেন বয়স একটি সংখ্যা মাত্র। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ৪৫ বছর ১৬১ দিন বয়সে মাঠে নেমে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। নিজের যোগ্যতা প্রমাণে খেলার মাঝে একটি পেনাল্টিও আটকে দেন।
সুন্দর এই খেলাটি মাঝে মাঝে পুরোপুরি অদ্ভুত হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচটি মাঠের শৃঙ্খলার বাইরে চলে যায়। এই ম্যাচটি ইতিহাসে ‘নুরেমবার্গের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। রেফারি রেকর্ড সংখ্যক ১৬টি হলুদ কার্ড ও ৪টি লাল কার্ড দেখান। খেলা শেষে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সাইডলাইনে একসঙ্গে বসে গল্প করতে দেখা যায়। আবার ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো অনন্য এক কীর্তি গড়েন। ক্যামেরুনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচেই তিনি পাঁচটি গোল করেন। এর কয়েকদিন পর রাশিয়া টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়লেও ওই পাঁচ গোল তাকে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট পুরস্কার এনে দেয়।
মাঠের বাইরেও এই টুর্নামেন্টের কিছু চমকপ্রদ পরিসংখ্যান রয়েছে। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১৯৫০ সালের ফাইনাল ম্যাচটিতে অফিশিয়ালি ১, লাখ ৩ হাজার ৮৫০ জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ধারণা করা হয় ভেতরে প্রায় ২ লাখের বেশি মানুষ গাদাগাদি করে ঢুকেছিল। টেলিভিশন সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া আয়োজন। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার ২০২২ সালের ফাইনাল ম্যাচটি বিশ্বজুড়ে দেড় বিলিয়নের বেশি দর্শক দেখেছেন।
টুর্নামেন্টটি ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে। ২০২২ সালে মরুভূমির তীব্র গরম এড়াতে প্রথমবারের মতো কাতারের শীতকালে খেলা অনুষ্ঠিত হয়। আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। প্রতিযোগিতাটি ৪৮টি দলে প্রসারিত হচ্ছে। কানাডা, মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে আয়োজকের দায়িত্ব পালন করবে। এই সম্প্রসারণের ফলে নতুন দেশের অংশগ্রহণ, ম্যাচ সংখ্যা ও রেকর্ড ভাঙার সুযোগ আরও বাড়বে।
খালি পায়ে গোল করা খেলোয়াড় থেকে শুরু করে চুরি যাওয়া সোনা খুঁজে বের করা বীর কুকুর— টুর্নামেন্টের এই সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যই একে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবে পরিণত করেছে। প্রতিটি বিশ্বকাপ তৈরি করে নতুন নায়ক, অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান ও অবিস্মরণীয় স্মৃতি। এই তথ্যগুলো জানার পর আপনি পরবর্তী ম্যাচের আড্ডায় বন্ধুদের মুগ্ধ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। যারা ফুটবল কোচ হতে আগ্রহী, তাদের জন্য ফুটবল কোচিংয়ের অনলাইন কোর্সটি অবিলম্বে শুরু করতে সাহায্য করতে পারে।


