ভবঘুরের বেশ আর চোখে ঘোরলাগা দৃষ্টি। মেগাসিটি ঢাকার বিভিন্ন পথেঘাটে এমন ছিন্নমূল শিশু-কিশোরের দেখা মেলে হরহামেশা। সবার কাছে তারা পরিচিত ‘পথশিশু’ নামে। ভিক্ষা, পলিথিন মুখে নিয়ে ‘ড্যান্ডি’ নামক মাদকসেবনের পাশাপাশি চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে।
গাড়ির জানালা দিয়ে ছোঁ মেরে মোবাইল নিয়ে ওরা দৌড় দেয় চোখের পলকে। অল্প বয়সী এসব শিশু-কিশোরদের থামাতে মাঝে মাঝেই চলে অভিযান। তবে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি তাদের।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার পাশে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ঘোর লাগা চাহনি নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় কয়েক কিশোরকে। কথা হয় তাদের একজনের সঙ্গে। চারপাশের তীব্র যানজট ও নগরের কোলাহল উপেক্ষা করে একাগ্র চিত্তে পলিথিন ব্যাগে ‘ড্যান্ডি’ ফুঁকছিল সে। ঠিক সে সময়েই পাশ দিয়ে যাওয়া এক পথচারীর পিছু নিল আরেক কিশোর। পথচারীর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা চাইলো সে। বিপত্তি আঁচ পেয়ে পায়ের গতি বাড়ালেন ওই পথচারী। একটা লাঠি হাতে কিশোরটি তার পিছু পিছু কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসে। অপেক্ষা নতুন ‘টার্গেট’ ধরার।
পাঁচতারকা হোটেল সোনারগাঁয়ের সামনের সড়ক ও হোটেল সুন্দরবনের মোড়ে প্রতি সন্ধ্যায় এমন ডজনখানেক কিশোরের দেখা মেলে। অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করে তারা। ব্যস্ত পথচারী এড়িয়ে চলেন তাদের।

কথা হয় এমনই এক কিশোরের সঙ্গে, বয়স আনুমানিক ১৫ বছর। জন্ম ঢাকাতেই, মা থাকেন কদমতলীতে আর বাবার পরিচয় বলতে পারে না। বেড়ে উঠেছে সদরঘাটের দিকে, এখন দিন কাটে কারওয়ানবাজার এলাকাতে। নির্দিষ্ট কোনো থাকার জায়গা নেই। প্লাস্টিক কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে মাঝে মাঝে। বাকিটা চলে চেয়ে-চিন্তে। অনেক বছর ধরেই ‘ড্যান্ডি’তে আসক্ত এই কিশোর।
চুরি-ছিনতাইয়ের কথা বলতেই রেগে যায় সে। ‘চুরি করি না, কাজ করে খাই’- দাবি করে সে। এরপর আর কথা বাড়তে না দিয়ে ধীরলয়ে মিশে যায় পার্কের অন্ধকারে।
রাজধানীর অধিকাংশ পার্ক, ফুটপাত ও উড়ালসড়কের নিচে এমন কিশোরদের দেখা যাচ্ছে অহরহ। ব্যস্ততম সড়কে প্রকাশ্যে ব্যাগ টেনে নেওয়া, মোবাইল টান দেওয়াসহ ছিনতাইয়ের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি যানজটে আটকে থাকা গাড়ির লুকিং-গ্লাসও প্রকাশ্যে খুলে নিয়ে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে তাদের।
কারওয়ানবাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাদকসেবী ও ভবঘুরে শিশু-কিশোরের সংখ্যা বেড়েছে এই এলাকায়। বাজারের আশেপাশে দলবেঁধে তারা গাঁজা খায়, ‘ড্যান্ডি’ সেবন করে, বসে ঝিমায়। এমনকি ট্রাক থেকে মালামাল নামানোর সময় সুযোগ পেলেই কিছু নিয়ে সটকে পড়ে।
পথশিশুদের জীবনধারা নিয়ে এরই মধ্যে দেশে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পথশিশুদের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশই নিরক্ষর, ১৩ শতাংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, ৬ শতাংশ এতিম বা বাবা-মা সম্পর্কে কিছূ জানে না। এদের মধ্যে মাদকাসক্তের হার ১২ শতাংশ।

সবশেষ আদমশুমারির তথ্য বলছে, দেশে প্রায় চার লাখের বেশি পথশিশু রয়েছে। যার অর্ধেকের অবস্থান ঢাকায়। তবে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনেসকো জানিয়েছে, এ দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২২ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৫৮ শতাংশ পথশিশু মাদকের সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ গাঁজা এবং ১৫ দশমিক ২ শতাংশ ‘ড্যান্ডি’তে আসক্ত। এমনকি মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ২১ শতাংশ পথশিশু।
এ বছর প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের জরিপে দেখা যায়, ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ পথশিশুর জন্মসনদ নেই। শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক নেই ৫১ দশমিক ৬ শতাংশের। জুলাই মাসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ সংশ্লিষ্ট এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও কমলাপুর রেল স্টেশন এলাকার ২৭ শতাংশ পথশিশু তাদের বাবা-মার পরিচয় জানে না।
এ সব শিশু-কিশোরের পুনর্বাসন নিয়ে কথা হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক খলিল আর রশীদের সঙ্গে। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য প্রায় দুই মাস আগে ‘শিশু সুরক্ষা শাখা’ খোলা হয়েছে। তবে এখনো সেভাবে কাজ শুরু হয়নি।
‘তবে আমরা পথ শিশু পুনর্বাসনে ইউনিসেফ, সেভ দ্যা চিলড্রেনসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি,’ বলেন এই কর্মকর্তা ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উইংয়ের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, রাজধানী ৯০ শতাংশ মাদকবিরোধী মামলাই দায়ের করে ডিএমপি। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানও চলছে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু সবক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া “ড্যান্ডির” মতো অপ্রচিলত মাদকের ক্ষেত্রে আইনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।’
‘কারো যদি আঠার গন্ধ নিয়ে নেশা হয় বা নোংরা পানির গন্ধ নিয়ে নেশা হয়, দেশের প্রচলিত আইনে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন,’ যোগ করেন ডিএমপির এই মুখপাত্র।

পথশিশুদের নিয়ে কথা হয় সমাজ সেবা অধিদপ্তরের ‘ভবঘুরে কার্যক্রম’ বিষয়ক উপপরিচালক বেগম সাঈদা আখতারের সঙ্গে। ‘ভবঘুরে’ শব্দটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘চাইলেই কাউকে “ভবঘুরে” বলা যায় না। পুলিশ যদি কাউকে আটক করে এবং একজন প্রথম শ্রেণির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি তাকে আইন অনুসারে “ভবঘুরে” ঘোষণা করেন, তাহলে তাকে “ভবঘুরে” বলা যায়।’
এরপর পুলিশ তাকে ‘ভবঘুরে’ হিসেবে ‘ভবঘুরে কার্যক্রমে’ হস্তান্তর করলে শুরু হয় পুনর্বাসনের কাজ।
সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসনের জন্য দেশের পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৭০০ জনকে রাখার ব্যবস্থা আছে। একদিন থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভবঘুরেদের পুনর্বাসনের জন্য সেলাইয়ের কাজ, সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ, বেকারি পণ্য তৈরি, বৈদ্যুতিক কাজ, রিকশা চালানো ইত্যাদি শেখানো হয়। এমনকি স্বল্প পুঁজিতে কর্মসংস্থানের উপযোগী সরঞ্জামও কিনে দেওয়া হয়।
ভবঘুরেদের অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতোও আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন কেউ কেউ। কর্মকর্তারা জানান, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার পর মনিটরিংয়ের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে পড়ে না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, পিছুটানের অভাব, শিক্ষার অভাব, মাদকাসক্তির কারণে অনেকের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগ্রহ থাকে না। তাই কাউন্সেলিং শেষে অনেকে আবার ফিরে যান পুরোনো জীবনে।


