কেউ বলেন ‘বিচি’, কেউ ‘বোতাম’, আবার কেউ কেউ বলেন ‘মাল’। এই তিনটি শব্দ সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকার মাদক কারবারিদের কাছে ইয়াবার সাংকেতিক নাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে প্রকাশ্যেই এসব শব্দ ব্যবহার করে চলে ইয়াবার কেনাবেচা ও চালান আদান-প্রদান। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো কেবল ‘শব্দ’ মনে হলেও, বাস্তবে এগুলোর আড়ালেই পরিচালিত হচ্ছে কোটি টাকার মাদক ব্যবসা।
ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবার চালান। এরপর বিয়ানীবাজারকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এই মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত চালান ও বাহক ধরা পড়লেও পুরো চক্রের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তবে, কিছুদিন ধরে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) কঠোর অবস্থানে থাকায় চোরাকারবারিরাও তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। তবুও একের পর এক মাদকের চালান ধরা পড়ছে।
সীমান্তজুড়ে নিরাপদ করিডোর
জকিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারতীয় সীমান্তের বড় একটি অংশ এখন মাদক চোরাকারবারিদের নিরাপদ করিডোরে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরোপয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে ইয়াবা পাচারের জন্য।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে জিরা, কসমেটিক্স ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান আলোচনায় থাকায় ইয়াবা পাচারের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে। সেই সুযোগে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট।
জেলের বেশে মাদক পাচার
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ইয়াবা পাচারের অভিনব কৌশল। একাধিক সূত্র জানায়, দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে চালান সংগ্রহ করা হয়।
আবার অনেক সময় ভারতের অংশ থেকে বিশেষভাবে মোড়ানো প্যাকেটে ইয়াবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত চিহ্ন দেখে বাংলাদেশের সহযোগীরা মাঝনদী থেকে সেই প্যাকেট উদ্ধার করেন।
অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে কখনো সাঁতার কেটে, কখনো ছোট নৌকায় নদী পার হয়ে, আবার কখনো সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে আনা হয়। পরে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের নির্দিষ্ট কয়েকটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে মজুত রাখা হয়।
আবার অনেক সময় ভারতের অংশ থেকে বিশেষভাবে মোড়ানো প্যাকেটে ইয়াবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত চিহ্ন দেখে বাংলাদেশের সহযোগীরা মাঝনদী থেকে সেই প্যাকেট উদ্ধার করেন।
অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে কখনো সাঁতার কেটে, কখনো ছোট নৌকায় নদী পার হয়ে, আবার কখনো সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে আনা হয়। পরে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের নির্দিষ্ট কয়েকটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে মজুত রাখা হয়।
বিয়ানীবাজার এখন নতুন ট্রানজিট রুট
সীমান্ত পার হওয়ার পর ইয়াবার চালান প্রথমে স্থানীয় বাহকদের হাতে যায়। এরপর বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন বাজার ও নির্দিষ্ট পয়েন্টে বড় কারবারিদের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিয়ানীবাজারে বিভিন্ন সড়ক ব্যবহারকারী বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীর বেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় ইয়াবার চালান। ঝুঁকির আশঙ্কা থাকলে বাহকরা যাত্রাপথ পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা নতুন বাহক ব্যবহারের কৌশলও গ্রহণ করেন। এতে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও অনেক সময় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযানে ধরা পড়ছে বাহক, ধরাছোয়ার বাইরে মূলহোতা
গত এক মাসে জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। গত ১৩ জুন বিয়ানীবাজার থানাধীন দুবাগ ইউনিয়নের পাঞ্জিপুরী এলাকায় চেকপোস্ট পরিচালনা করে যাত্রীবাহী বাস হতে ৯ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করেছে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ। এ সময় একজনকে আটক করা হয়েছে।
১৫ জুন জকিগঞ্জ থানাধীন মানিকপুর ইউপির শাহজালালপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এক হাজার পিস ইয়াবা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় দু’জন বাহক পালিয়ে যায় বলে জানায় পুলিশ।
আবার ২৫ জুন জকিগঞ্জের খলাছড়া ইউনিয়নের জকিগঞ্জ-শেওলা সড়কে অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ, গত ২৯ জুন জকিগঞ্জের মানিকপুর ইউনিয়নের খাসেরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ।
পুলিশের অভিযানে এসব মাদকের সঙ্গে যাদের আটক করা হয়, তারা কেউই মূল ব্যবসায়ী না। মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে।
সিলেট জেলার পুলিশ সুপার চৌধুরী মোহাম্মদ যাবের সাদেক বলেন, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে। গতমাসে জকিগঞ্জ থেকে ১০ হাজার ও বিয়ানীবাজার থেকে নয় হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকের চালানের সঙ্গে শুধু বাহক ধরা পড়ছে এমন না, যারা কারবারি তারাও আটক হচ্ছেন। এ ছাড়াও যারা মাদকের তালিকাভুক্ত কারবারি তাদের বিষয়ে পুলিশের নজরদারি রয়েছে বলেও জানান তিনি।


