চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিল বহাল থাকায় নির্বাচনী মাঠ কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়েছে বিএনপির জন্য। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠের বাইরে চলে যাওয়ায় এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের জন্য নির্বাচন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ভোট বিশ্লেষকরা।
সোমবার নির্বাচন কমিশনে ফজলুল হকের আপিল শুনানি শেষে তার আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতার কারণে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এর ফলে এই আসনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে।
এর আগে, গত ৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. জিয়াউদ্দীন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামায় ফজলুল হক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন এবং গত ২৮ ডিসেম্বর তিনি সে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
তবে মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা বলা হলেও এর স্বপক্ষে কোনো দাপ্তরিক নথি জমা দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে রিটার্নিং কর্মকর্তার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন ফজলুল হক। কিন্তু শুনানি শেষে কমিশন মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এ বিষয়ে ফজলুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করেছি। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস দেখা করার সময়ও দিয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আপিলে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আপিল নেয়নি।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতমূলক দাবি করে জামায়াতে ইসলামী আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
নগর জামায়াতের পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রার্থীর আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশ নির্বাচন কমিশন বাতিল করবে। কারণ, এই আদেশ সংবিধান ও আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। এটি বৈষম্যমূলকও, কেননা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন এবং সেগুলো বাতিল হয়নি।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে গত ৪ জানুয়ারি মোট ১৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই করা হয়। এর মধ্যে ৯ জনের মনোনয়ন বৈধ এবং চারজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াতের ফজলুল হকও ছিলেন। আপিল নামঞ্জুর হওয়ায় তিনি চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের বাইরে চলে গেলেন।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছেন তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত কয়েকটি দলের প্রার্থীরা। তারা হলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মো. শফি উদ্দিন কবির, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুস শুকুর, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মো. নেজাম উদ্দীন, জনতার দলের মো. হায়দার আলী চৌধুরী এবং গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ।
এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও নেজামে ইসলাম পার্টি সমমনা ১১ দলের জোটে রয়েছে। তাই জোট থেকে যে দলকে দেয়া হবে সেটিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফজলুল হক থাকলে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। নির্বাচন কমিশনে বাতিল হলেও প্রত্যাশা করব তিনি যথাযথ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসুক। সবসময় তার জন্য শুভকামনা থাকবে। আমি নির্বাচনী মাঠে তাকে স্বাগত জানাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব দলের কোনো প্রার্থীরই এই আসনে শক্ত ভোটব্যাংক নেই। ফলে কার্যত ‘খালি মাঠে গোল দেওয়ার’ সুযোগ পাচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. সফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারবে না। সুতরাং মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি এবং জামায়াত এই দুই দলের মধ্যে। যেহেতু জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল বহাল রয়েই গেছে সেক্ষেত্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আর থাকছে না।’
‘তা ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে যেহেতু জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী তিনি হাইকোর্টে রিট করলেও মনোনয়ন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বলে মনে হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম জেলায় মোট ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত চট্টগ্রাম-৯ আসন।
১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান বিজয়ী হয়ে মন্ত্রী হন। ২০০১ সালে আবারও বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান বিজয়ী হয়ে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী হন। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু বিজয়ী হন। সবশেষ ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বিজয়ী হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল লড়াই হবে। কিন্তু জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল বহাল থাকায় সেই সমীকরণ ভেঙে গেছে।


