চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত অন্তত ৬০টি স্থানে উন্মুক্ত অবস্থায় গৃহস্থালি বর্জ্য জমে আছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না করা, সিটি করপোরেশনের তদারকির ঘাটতি ও কর্মীদের অবহেলায় দিনের পর দিন সড়কের পাশে ময়লার স্তূপ তৈরি হচ্ছে। তীব্র দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী।
নগরীর ২ নম্বর গেট, দামপাড়া, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার, নিউমার্কেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন মোড়, নয়াবাজার বিশ্বরোড ও আকবরশাহসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাস্তায় গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়। পরে এই বর্জ্য বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিননগর ও হালিশহরের আনন্দবাজার ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হয়। তার আগেই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনগুলো ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি বর্জ্য বহন করছে। অনেক স্থানে ডাস্টবিনের চারপাশে ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত ময়লা ছড়ানো। কোথাও আবর্জনার স্তূপ ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের একটি লেন দখল করে নিয়েছে। এতে পথচারী ও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। পচা শাকসবজি, মাছের আঁশ ও গৃহস্থালি বর্জ্যের উৎকট গন্ধে চারপাশের পরিবেশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়সূচি না মেনে বর্জ্য সংগ্রহ করায় ডাস্টবিন উপচে রাস্তায় ময়লা ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ও সরকারি ছুটির দিনে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শিথিল থাকায় পরদিন সকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়।
নগরীর ষোলশহরের বাসিন্দা মো. আফসার ২ নম্বর গেট এলাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বাসা থেকে হেঁটে ২ নম্বর গেট আসার পথে ময়লার স্তূপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে দ্রুত হেঁটে পার হতে হয়।’ হালিশহরের বাসিন্দা নুসরাত করিম বলেন, ‘নয়াবাজার বিশ্বরোড মোড়ে রাস্তার ওপর বাসাবাড়ির বর্জ্য রাখা হয়। ওই এলাকা পার হওয়ার সময় তীব্র দুর্গন্ধে খুব খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়।’ দামপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মূল সড়কের অনেকটা অংশ ময়লায় দখল হয়ে গেছে। এখানে হাঁটাচলা করতেই অস্বস্তি লাগে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। চসিক প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারে। বাকি প্রায় ১ হাজার টন বর্জ্য অসংগৃহীত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই বর্জ্যের বড় অংশ পরে নালা ও খালে গিয়ে জমা হয়।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ১৯৮ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছেন। দুই শিফটে তারা কাজ করেন। সারাদিন বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে সন্ধ্যার পর ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. লিটন রাস্তার ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য গাড়িতে লোড করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনের একই স্থানের ময়লা প্রতিদিন ডাম্পিং স্টেশনে পাঠাই না। সুপারভাইজার যেদিন যেখানে নিয়ে যায়, সেখানের বর্জ্য গাড়িতে লোড করি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত বর্জ্যের স্তূপ জীবাণুর প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব স্থানে মশা, মাছি ও ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি বাড়ছে। এটি বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। বৃষ্টির পানি জমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক মশার লার্ভা তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৫৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করলে ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ময়লার সংস্পর্শে আসার কারণে চর্মরোগ ও চোখের সংক্রমণও বাড়ছে। বর্ষাকালে বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লে টাইফয়েড, কলেরা ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
পরিবেশবিদদের মতে, বৃষ্টির সময় রাস্তার বর্জ্যের তরল খাল-নালায় গিয়ে পানি ও মাটি দূষিত করছে। ময়লার ভাগাড় থেকে নির্গত লিচেট মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকে ভারী ধাতু দিয়ে দূষিত করছে। পরিবেশবিদ কাজী আশিকুর রহমান আরাফ বলেন, ‘চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য জমা রাখায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি ও বায়ু দূষণ বাড়ছে। দ্রুত স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, বিকেন্দ্রীকৃত বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের কারণে মাটির নিচে আধুনিক বর্জ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘ইউটিলিটি পাইপের কারণে মাটির নিচে ডাস্টবিন নির্মাণ করা যাচ্ছে না। মাটির ওপর একটি আবদ্ধ ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেন দুর্গন্ধ ছড়ানো কমে ও বর্জ্য উন্মুক্ত অবস্থায় না থাকে।’


