মানুষের ঢল, জনস্রোত, জনসমুদ্র। কোনো স্থানে মানুষের উপস্থিতি বোঝাতে চিরপরিচিত কয়েকটি শব্দ। তবে এসব কোনো শব্দ দিয়েই বোঝানো যাচ্ছে না বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা। দশ লাখ? পনেরো লাখ? কুড়ি লাখ? নাকি তারও বেশি? এই সংখ্যা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় চলবে দীর্ঘকাল।
কোনো মুসলমানের জানাজায় অংশ নেওয়া একেবারেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। শ্রদ্ধার, ভালোবাসার কারও জানাজায় স্বতস্ফূর্তভাবেই অংশ নেয় মানুষ। খালেদা জিয়ার প্রতি অন্তরের সেই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাতে এসেছে মানুষ। সকাল থেকে রাজধানী ঢাকার প্রতিটি সড়ক ধরে হেঁটে আসছিলেন তারা। চোখেমুখে প্রিয় নেত্রীকে হারানোর বিষন্নতার ছাপ। কোনো মিছিল নেই, কোনো স্লোগান নেই। নিজেদের মধ্যে কথাও হচ্ছিল অনেকটা ফিসফিসিয়ে, যেন জোরে কথা বললে প্রিয় নেত্রীর ঘুম ভেঙে যাবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কারও জানাজায় উপস্থিতির সংখ্যা বোঝাতে জনসমুদ্র শব্দ ব্যবহার হয়েছে একাধিকবার। ১৯৭৬ সালের আগস্টে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, একই বছর নভেম্বরে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী আর ১৯৮১ সালের জুনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় জনসমুদ্র হয়েছিল।
কার জানাজায় সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়েছিল- আবারও সেই আলোচনা সামনে আসে কিছুদিন আগে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় বিপুল সংখ্যায় মানুষের উপস্থিতির পর। তবে যারা এই সবগুলো জানাজা দেখেছেন, সেই বয়োজ্যেষ্ঠদের বর্ণনায় জিয়াউর রহমানের জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। কারও কারও মতে অন্তত ১০ লাখ।
একবিংশ শতাব্দীর ২০২৫ সালের শেষ দিনে এক নতুন দৃশ্য দেখল বাংলাদেশ, বরং বলা ভালো ইতিহাস তৈরি হতে দেখল। বছরের শেষ দিন ছিল বিএনপির প্রয়াত চেয়াপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা। আয়োজনটি ছিল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে, যেখানে ৪৪ বছর আগে তাঁর স্বামী ব্যর্থ-সেনাঅভ্যুত্থানে নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল।

৩১ ডিসেম্বর বুধবার সকাল থেকেই স্রোতের মতো মানুষ ছুটেছে মানিক মিয়া এভিনিউতে। কোনো হৈ-হল্লা নেই, শোকে কাতর মানুষ জানাজায় অংশ নিতে সুশৃঙ্খলভাবে হেঁটে চলেছে। এক সময় মানুষে ভরে গেছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, মানুষ চলে এসেছে রাজধানীর প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ আর সবচেয়ে চওড়া রাস্তায়। এক সময় সেই রাস্তায়ও আর জায়গা নেই, এরপরও মানুষের স্রোত থামছে না। তবু মানুষের হুড়োহুড়ি নেই, মানিক মিয়া এভিনিউতে জায়গা না পেয়ে আশেপাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছে জানাজায় অংশ নিতে, প্রিয় নেত্রীর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে।
জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের সেই জমাটবাঁধা সারি মানিক মিয়া এভিনিউ ছাড়িয়ে পূবদিকে ফার্মগেট হয়ে চলে গেছে একদিকে ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেট, অন্যদিকে বাংলামোটর পর্যন্ত। পশ্চিমে একদিকে আসাদ গেট ছাড়িয়ে মোহাম্মদপুর, অন্যদিকে ধানমন্ডি রাসেল স্কয়ার। উত্তরে মানুষের সারি ছুঁয়েছে আগারগাঁও। সবদিকেই মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে মানুষের সারির এই দূরত্ব দেড় থেকে দুই কিলোমিটার।
অতীতের সকল উপস্থিতির রেকর্ড ভেঙে খালেদা জিয়ার জানাজায় ছিল মানুষের মহাসমুদ্র। সবচেয়ে দৃষ্টিকাড়া দিক ছিল শৃঙ্খলা। যে যেখানেই দাঁড়িয়েছে সেখানে কোনো ধাক্কাধাক্কি হৈ-হল্লা ছিল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন যেমন নির্দেশনা দিয়েছেন, মানুষ আন্তরিকভাবে তা মেনে নিয়েছেন। মানুষের এমন এক মহাসমুদ্রেও যেন ছিল একরকম নীরবতা। তবে অন্তরে প্রিয় নেত্রীর জন্য প্রার্থনা। মানুষ এদিন প্রমাণ করেছে নীরবতা হিরন্ময়।


