বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ স্পিনার নাঈম হাসানকে মধ্যরাতে আটক করে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে। ঘটনার পরদিন শনিবার সকালে নাঈমের বাসায় গিয়ে তার ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। এ সময় তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরের চান্দগাঁও থানার ফরিদার পাড়া এলাকায় নাঈম হাসানের বাসভবনে যান সিএমপি কমিশনার। তার সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নাঈম ও তার বাবা মাহবুব আলমসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনার।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, পুলিশ একটি পেশাদার বাহিনী। কেউ যদি অপেশাদার আচরণ করে, সেই দায় পুলিশ বিভাগ নেবে না। ব্যক্তিগতভাবে তাকে সেই দায় বহন করতে হবে। ঘটনার তদন্তে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
নাঈম হাসানের অভিযোগ, শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। পথে নগরের লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের একটি দল তাদের গাড়ি থামায়।
নাঈম জানান, পুলিশ সদস্যরা প্রথমে তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। পরে ব্যাগ তল্লাশির কথা বললে তিনি সহযোগিতা করতে রাজি হন। কিন্তু হঠাৎ তাকে ‘আসামি’ বলে সিএনজিতে উঠতে বাধ্য করা হয়। তিনি দাবি করেন, এরপর কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর শুরু করেন।
নাঈম সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন আমার গলা চেপে ধরে গাড়িতে তোলে। আমি বের হওয়ার চেষ্টা করলে দুইজন আমাকে চেপে ধরে রাখে, আরেকজন পাইপ দিয়ে মারতে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, তার সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম ও পরিচয়পত্র ছিল। আশপাশের অনেক মানুষ তাকে চিনতেও পারেন। তবু পুলিশ সদস্যরা তা আমলে নেয়নি।
নাঈমের অভিযোগ, পরে তাকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রথমে রূঢ় আচরণ করেন। পরে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলার পর তার আচরণ বদলে যায়। একপর্যায়ে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তা ইসরাফিল খসরুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন নাঈম। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী। সিএমপি জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার বলেন, তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশের পরিচয়ে অপকর্মে জড়িত এক কথিত ডিবি সোর্সকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাঈমের পরিবারের সদস্যরা কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশি গাড়ির বদলে সাধারণ সিএনজিতে করে তাকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা রহস্যজনক। তাদের আশঙ্কা ছিল, এটি অপহরণের চেষ্টাও হতে পারত। এ বিষয়ে কমিশনার বলেন, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে সিএমপি। কমিশনার বলেন, পুলিশ কোনো সদস্যের পক্ষ নিয়ে তদন্ত করে না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য ঘটনা বের করে আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, চেকপোস্ট ও টহলরত পুলিশ সদস্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের আচরণ আরও মানবিক ও পেশাদার করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে নাঈম হাসান বাসায় বিশ্রামে আছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে তারা সুষ্ঠু বিচারের ব্যাপারে আশাবাদী।


