দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যের আবেশে মোড়া ‘বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা’।
দুই শতাব্দীর প্রাচীন এই মেলাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাহারি জাতের নানা নামের ঘোড়া এবং হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ।
এলাকাবাসী মনে করেন, দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য লালন করা তাদের সামাজিক দায়িত্ব।
ফুলবাড়ী শহর থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং বারাই হাট থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দুই নম্বর আলাদীপুর ইউনিয়নে ২০২ বছর ধরে নিয়মিত বসছে এই মেলা। প্রতিবছর বৈশাখের ৯ বা ১০ তারিখে মেলার সূচনা হয়।
তবে, ১৩ বৈশাখ থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কেনাবেচার রসিদ (ছাপা) কাটার কাজ। মেলা মাসব্যাপী চললেও মূল আকর্ষণ পশুর হাট থাকে ১০ দিন। একসময় গরু-মহিষের প্রাধান্য থাকলেও সময়ের বিবর্তনে এটি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ ‘ঘোড়ার মেলা’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে।
মেলায় আসা ঘোড়াগুলোর নাম শুনলে যে কেউ অবাক হবেন। যেমন দুমকি, সিডর, দুর্বার, বিজলি, কিরণ মালা, রানী কিংবা সুইটি। শুধু নামেই নয়, এদের ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তায়ও রয়েছে বিশেষত্ব। মেলা প্রাঙ্গণে ঘোড়াগুলোর দুলকি চলন আর বিদ্যুৎ গতি দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য দর্শনার্থী।
রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে আসা বিক্রেতা রমজান আলী তার ‘নিউ পাওয়ার টেন’ নামের বড় ঘোড়াটির দাম হাঁকছেন ৭ লাখ টাকা। ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেলে তিনি এটি বিক্রি করবেন। বগুড়ার মেহরাব হোসেন নিয়ে এসেছেন ৫ বছর বয়সী লাল ঘোড়া ‘সম্রাট’। রেসিং বা দৌড়ের জন্য উপযোগী এই ঘোড়াটির দাম চাওয়া হচ্ছে ৩ লাখ টাকা। এছাড়া নবাবগঞ্জের স্বপ্নপুরী থেকে আসা ঘোড়ার দাম দেড় লাখ এবং ১৭ মাস বয়সী এক দৃষ্টিনন্দন ঘোড়ার দাম চাওয়া হচ্ছে আড়াই লাখ টাকা।
ঘোড় সওয়ারি আমিনুল ও রিয়াজ জানান, তাদের বাপ-দাদারা এই মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন। সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা এখনও এখানে আসেন।
তবে আক্ষেপ করে তারা বলেন, আগে ঘোড়দৌড়ের জন্য বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও বর্তমানে তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, তাই কেনাবেচায়ও কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে।
মেলার ইজারাদার সফিকুল ইসলাম ও রুবেল হোসেন জানান, মেলার শৃঙ্খলা রক্ষায় ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিরলস কাজ করছেন।
ঘোড়ার মেলা কমিটির সভাপতি শিক্ষক আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ও পরে নেপাল, ভুটান ও ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে ঘোড়া আসত। সেই জৌলুস এখন স্মৃতি হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মালিকরা এখনও এই মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন।
আলাদীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান দছিম উদ্দীন মণ্ডল জানান, উত্তরবঙ্গের প্রায় সব জেলাসহ পাবনা, নাটোর ও জয়পুরহাট থেকে এখানে ঘোড়া আমদানি হয়।
নিরাপত্তা বিষয়ে ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. লতিব শাহ নিশ্চিত করেছেন যে, মেলায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ হাছান জানিয়েছেন, মেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগীতা দেওয়া হচ্ছে।
মেলা প্রাঙ্গণের ৮ একর জমি এখন ঘোড়া, ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎসুক মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পছন্দের ঘোড়াটি বুঝে নিতে ক্রেতাদের দর কষাকষি আর দৌড় পরীক্ষা সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি এই বুড়াচিন্তামন মেলা।


