সরকারের তরফে ঘোষণা এলেও রাজধানীতে লোডশেডিং শুরুর তথ্য মেলেনি। সাপ্তাহিক ছুটির দিন চাহিদা কম থাকাও এর একটি কারণ। সরকারি হিসাবে এদিন বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদাও আগের দিনের তুলনায় এক হাজার মেগাওয়াটের মতো কম।
সারা দেশে অব্যাহত লোডশেডিংয়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তারা ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে যাচ্ছেন।
এমন সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘শহরের মানুষ আরামে (শান্তিতে) থাকবে এবং গ্রামের মানুষ অর্থাৎ খেটে খাওয়া কৃষক কষ্টে থাকবে এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। সেজন্য শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকতে পারে না।’
তবে পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের বাসিন্দা সুমন রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সারা দেশে যে কথা শুনি, তাতে ভালোই তো আছি। বিদ্যুৎ যায় না। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ভয়ে ছিলাম। কিন্তু আজ একবার ১০ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ গিয়েছিল। এখন গভীর রাতে কী হয় তা জানি না।’
তবে ঢাকার বাইরের চিত্র আগের মতোই। বিদ্যুতের যাওয়া-আসা ঠাকুরগাঁওয়ের ফারহান রহমানের কাছে আরও বেশি বিরক্তিকর। কারণ, এসএসসি পরীক্ষার কারণে ঘেমে নেয়ে গেলেও পড়ার টেবিল থেকে ওঠার সুযোগ নেই।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ যদি আধাঘণ্টা থাকে, তাহলে দেড় ঘণ্টা থাকে না। পরীক্ষার আগে এমন পরিস্থিতি আমাদের জন্য উদ্বেগের।’
উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নেসকোর ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, তাদের জেলায় চাহিদা ২৩ থেকে ২৬ মেগাওয়াট। তবে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১১ মেগাওয়াট।
দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট সীমিত থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দিনে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
ঝালকাঠি থেকে টাইমসের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, শুক্রবার শহরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগের দিনের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও দিনের বেলায় তিন ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল।
কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিও একই তথ্য জানিয়েছেন। তবে শহরের চেয়ে গ্রামের পরিস্থিতি বেশি খারাপ, সেই বিষয়টিও জানিয়েছেন তারা।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পিক আওয়ারে দেশের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে সম্ভাব্য লোডশেডিং প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট।
আগের দিন বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উৎপাদন ধরা হয় ১৪ হাজার। ফলে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার মেগাওয়াট। বুধবার পাওয়ার গ্রিডের হিসাবে পিক আউয়ারে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
যদিও সরকারের পরিসংখ্যান বিভ্রান্তিকর। কারণ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আলাদা যে হিসাব দেয়, সেখানেও লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
বিদ্যুৎ সংকট কেন?
দেশে স্থাপিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। তবে গ্যাস সংকটে ১৮টি, তরল জ্বালানির অভাবে ১৪টি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আরও পাঁচটি কেন্দ্র উৎপাদনে নেই।
বন্ধের তালিকায় আছে ভারতের আদানির ১৬০০ মেগাওয়াটের দুটি এবং বাংলাদেশে ৫২৫ মেগাওয়াটের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন টাইমসে বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির ঘাটতি স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতে পারত।’
তার মতে, ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা গেলে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব হতো।


