ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় পুনরায় সচল হতে শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এরই মধ্যে দেশের অন্তত ২৬টি জেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে।
নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের পরাজয় এবং বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করার পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে মনোবল সঞ্চার হয়েছে। এর ফলে অনেক কর্মী-সমর্থক নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন।
তবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বা জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের এলাকায় ফেরার খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে যারা ফেরার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের অনেককেই পুলিশের হাতে আটক হতে হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের পর গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন শ্রমিক জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে সালাম জানান। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মূলত বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে আগুনে পোড়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয়গুলো খোলার তোড়জোড় শুরু হয়।
আওয়ামী লীগের এই তৎপরতায় জামায়াত ইসলামী ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় কার্যালয় খোলার পর আবারও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং পুলিশের হাতেও অনেকে আটক হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান ও দলীয় নির্দেশনা সম্পর্কে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম জানান, তাদের নেত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে প্রয়োজনে তাদের পোড়া বাড়িতেও ফিরে যেতে হবে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। তিনি মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার মধ্যে তিনি খারাপ কিছু দেখছেন না।
এদিকে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলে জমায়েত হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
সরেজমিনে জানা গেছে, নোয়াখালী শহরের টাউন হল মোড়ে গত সোমবার সকালে দলীয় কার্যালয় খোলার পর পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। খুলনা মহানগর কার্যালয় খোলার পর রাতে দুর্বৃত্তরা সেটিতে আগুন দেয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকা, শরীয়তপুর শহরের পালং বাজার, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর, কুড়িগ্রাম, বরগুনার বেতাগী, রাজবাড়ী, হবিগঞ্জ, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নড়াইলের লোহাগড়া, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, পটুয়াখালীর দশমিনা, ফরিদপুর, বগুড়া, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লার বুড়িচং, ময়মনসিংহের তারাকান্দা, নওগাঁ ও টাঙ্গাইলের গোপালপুরে নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয় খুলেছেন। কোথাও জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, আবার কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়েছে।
সম্প্রতি ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে কিছু লোক জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ও পরবর্তী সময়ে সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রায় সব কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। সে সময় অনেক নেতাকর্মী ‘মব’বা গণপিটুনির শিকার হয়েছিলেন। তবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশ থেকে ‘মব কালচার’চিরতরে বিদায় করার ঘোষণা দিলে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। বিদেশে পলাতক নেতারা না ফিরলেও দেশে থাকা কর্মীরা স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এলাকায় ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে জামায়াত ও এনসিপি নেতাকর্মীরা অনেক স্থানেই এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানাচ্ছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন।


