রাজধানী ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ নামের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার উদ্বোধন করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
জাঁকজমক আয়োজনে লাল গালিচা বিছিয়ে মিরপুরের বাউনিয়ায় খাল খনন ও পুনরুদ্ধার কাজের উদ্বোধন করা হলেও এক বছর পরও তার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খাল খননের সুফল তো মিলছেই না, উল্টো খালগুলো এখনো মারাত্মকভাবে দূষিত অবস্থায় রয়েছে।
একই পরিস্থিতি নগরের বাকি খাল, নালা এবং জলপথগুলোতে। এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এসব খাল, নানা ভরে আছে আবর্জনা, দূষিত পানি আর তীব্র দুর্গন্ধে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রকল্প আটকে আছে বিশ্বব্যাংকের কঠোর শর্তে।
ধারাবাহিকভাবে বিগত প্রায় সব সরকারই রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী খাল ও নদী পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করলেও বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও বাস্তব চিত্রে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার ঘোষণা, বড় আকারের পরিকল্পনা ও জাঁকজমক উদ্বোধনের পরও খাল পুনরুদ্ধারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বরং রাজধানীর খালগুলোতে এখন আটকে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত পানি, আবর্জনা, প্লাস্টিক ও পলিথিনের স্তূপ যা ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট করেছে। কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ বাস্তবে ঢাকার বিভিন্ন জলপথগুলোকে প্রাণহীন ও বিষাক্ত পানির স্তূপে পরিণত হয়েছে।
আবর্জনায় ভরা খালই ব্যর্থতার স্পষ্ট চিত্র
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লু নেটওয়ার্ক উদ্যোগের আওতায় সরকারি অর্থায়নে ছয়টি খাল পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়।
এগুলো হলো মিরপুর-১৩ ও ১৪ এলাকার বাউনিয়া খাল, রূপনগর আবাসিক এলাকার রূপনগর খাল, হাতিরঝিলের পূর্বে রামপুরা-বেগুনবাড়ি এলাকার বেগুনবাড়ি খাল, মান্ডা-মুগদা-খিলগাঁও এলাকার মান্ডা খাল, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার কালুনগর খাল এবং বনানী, গুলশান ও মহাখালীর পাশে করাইল বস্তির কাছে করাইল খাল।
তবে এক বছরের বেশি সময় পার হলেও খালগুলোর অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
মিরপুর-১৩ ও ১৪, ভাষানটেক ও মানিকদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৭ দশমিক ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাউনিয়া খাল এখন আর খাল হিসেবে চেনাই কঠিন।
খালের পানির বড় অংশ শুকিয়ে গেছে, সেখানে জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিক আর পলিথিনের স্তূপ, আশপাশের আবর্জনার স্তূপ থেকে নিয়মিত বর্জ্য এসে পড়ছে খালে। এসব আবর্জনা প্রায় সময়ই খোলা আকাশের নিচে পোড়ানো হয়।

খালের পাশে উঁচু বেদি তৈরি করে গড়ে ওঠা সাগর ফার্নিচারের মালিক আয়ুব আলী বলেন, ‘২০২৫ সালে উপদেষ্টা রিজওয়ানা এসেছিলেন। সে সময় শুধু ব্রিজের নিচের অংশটুকুই পরিষ্কার করা হয়েছিল। বাকি খাল সেভাবেই পড়ে আছে। এখন তো পরিষ্কার অংশেও আবার আবর্জনা ভরে গেছে।’
স্থানীয়রা জানান, খালের পাশে একটি ২০ তলা সরকারি ভবন থাকায় পরিষ্কার কার্যক্রম মূলত ওই ভবনের সামনের দৃশ্যমান অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল।
স্থানীয় মুদি দোকানি ফরিদ বলেন, ‘ঈদের আগে অল্প সময়ের জন্য কিছু অংশ পরিষ্কার করা হয়েছিল, তার আগে পুরো খালটাই ছিল আবর্জনায় ভরা।’
রূপনগর খালের চিত্রও একই রকম।
মিরপুরের আবাসিক এলাকাগুলোকে তুরাগ নদীর সঙ্গে যুক্ত করা প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল এখন বাসিন্দাদের কাছে এক ‘জীবন্ত দুঃস্বপ্ন’।
চার দশক ধরে খালের পাশে বসবাস করা বারেক মিয়া বলেন, ‘১৯৮৮ সালের বন্যার সময়ও এই খালের পানি এত পরিষ্কার ছিল যে মানুষ গোসল করত, মাছ ধরত। এখন পুরোটা প্লাস্টিক-পলিথিন আর পচা বর্জ্যে ভরা।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, খালে আংশিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনাতেই নয় কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রথম ধাপে ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ৯০০ মিটার অংশে তিন কোটি ৩৯ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে।
৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর-লাউতলা খালের অবস্থাও ভিন্ন নয়। এই খাল থেকে আসা দুর্গন্ধে দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে জানান শ্যামলী হাউজিংয়ের বাসিন্দা হেমত সিকদার।
তিনি বলেন, ‘গন্ধে থাকা কঠিন হয়ে যায়, আর ভারী বৃষ্টিতে খালের নোংরা পানি রাস্তায় উপচে আসে, বাসায় ঢুকে পড়ে।’
পাশের বস্তিতে ২০ বছর ধরে বসবাস করা রোজিনা বেগম বলেন, ‘মশা নিধনের জন্য দল আসে, কিন্তু তারা হাউজিং এলাকায় স্প্রে করে, আমাদের বস্তিতে করে না। সন্ধ্যায় মশারির নিচে বসে থাকতে হয়।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার পরিস্থিতি আরও খারাপ।
হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যাওয়া কালুনগর খাল এবং মান্ডা, মুগদা ও খিলগাঁও হয়ে বালু নদীতে যুক্ত মান্ডা খাল কার্যত তাদের জলপ্রবাহের ক্ষমতা হারিয়েছে।
বছরের পর বছর জমে থাকা বর্জ্যে খালগুলো এমনভাবে ভরাট হয়েছে যে অনেক জায়গায় মানুষ সরাসরি খালের উপর দিয়ে হেঁটে যায়। অর্থাৎ খালের পানির গতিপথ বন্ধ হয়ে গেছে।
মান্ডা এলাকার বাসিন্দা সাদিকুর রহমান বলেন, ‘গত তিন-চার বছর ধরে একই অবস্থা। পানি স্থির থাকে, বর্ষায় খালের ময়লা নিচু এলাকায় ঘরে ঢুকে পড়ে।’
থমকে গেছে ব্লু নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন
২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া ব্লু নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।
ঢাকার পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পটির প্রথম ধাপ ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এখনো প্রশাসনিক অনুমোদন পায়নি।
২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪০৬ মিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে ৩৭০ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে, ২৬ মিলিয়ন ডলার সরকারি তহবিল থেকে এবং ১০ মিলিয়ন ডলার বেসরকারি খাত থেকে আসার কথা ছিল।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এল সৈকত বলেন, ‘প্রকল্পটি সংশোধনের পর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।’
ব্লু নেটওয়ার্ক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন কমিটির সাবেক প্রধান পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘শুরুতে এই উদ্যোগের জন্য আলাদা কোনো প্রকল্প বা বাজেট ছিল না। সিটি করপোরেশন, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের বিদ্যমান জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল ব্যবহার করেই প্রাথমিক কাজ শুরু হয়।’
তিনি জানান, তার কমিটি রাজধানীর ১৯টি খাল চিহ্নিত করে পুনরুদ্ধার কাজের জন্য ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার প্রাথমিক ব্যয় অনুমান করে। এর মধ্যে ছয়টি খালে কাজ শুরু হয়েছিল।
তবে আট মাস আগে দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে আর কোনো হালনাগাদ তথ্য পাননি বলে জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতিই প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা। কারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলে বিশ্বব্যাংক অর্থ ছাড় দেয় না।
এ বিষয়ে সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সিটি করপোরেশনের শত কোটি টাকার ব্যয়েও অগ্রগতি নেই
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পটি মূলত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০২২ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে অনুমোদন পায়।
কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল নিয়ে গঠিত ৮৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ওই বছরের নভেম্বরে। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
তবে এখন পর্যন্ত সে প্রকল্পেরও কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহসান হাবিব বলেন, ‘খাল উদ্ধার নিয়ে নির্দেশনা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি খুব ধীর।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে প্রায় ৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি খালের ১৫ দশমিক ২৩ কিলোমিটার অংশ থেকে বর্জ্য অপসারণ ও খনন কাজ করা হয়েছে।
গত পাঁচ অর্থবছরে খাল খনন, সীমানা নির্ধারণ ও উন্নয়ন কাজে সংস্থাটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
কাঠামোগত ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতায় স্থবিরতা
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এম মাকসুদুর রহমান বলেন, ঢাকায় এখন আর প্রকৃত বন্যা হয় না, বরং খাল দখল ও জলপথে বাধার কারণে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘দখল হওয়া খাল দিয়ে পানি নামতে পারে না। অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায় এবং দূষিত পানি মাসের পর মাস একই জায়গায় স্থির থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, বিভিন্ন সরকার বহু উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু বাস্তব ফল খুবই সীমিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া ব্লু নেটওয়ার্ক প্রকল্পও তার ব্যতিক্রম নয়।
তার মতে, খাল পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার কাঠামোগত ত্রুটির কারণে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে পানি এক জায়গায় আটকে যাচ্ছে।
‘এ কারণে নিয়মিত খাল খনন ও পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও টেকসই ফল পাওয়া যাচ্ছে না’, যোগ করেন আদিল মোহাম্মদ খান।
সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও এক্ষেত্রে বড় সমস্যা বলে মনে করেন তিনি। সতর্ক করে বলেন, এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


