ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা যখন করা হয়, তখন অবচেতন মনেই সবার আগে কক্সবাজার বা পতেঙ্গার নাম চলে আসে। তবে সেই চেনা গন্তব্যের বাইরে চট্টগ্রামের খুব কাছেই ডানা মেলছে এক নতুন পর্যটন স্পট, যা বর্তমানে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় এই মুক্তাটির নাম ‘পারকি সমুদ্র সৈকত’।
একসময় কেবল স্থানীয়দের কাছে পরিচিত থাকলেও, ২০১৩ সাল থেকে বারাসত ইউনিয়ন পরিষদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটি আজ একটি প্রতিষ্ঠিত পর্যটন স্পট হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু টানেল চালুর পর থেকে এই সৈকতের ভাগ্য যেন রাতারাতি বদলে গেছে, যা পর্যটকদের কাছে এটিকে আরও সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতটি লম্বায় প্রায় ১৩ কিলোমিটার। ভৌগোলিকভাবে এটি অত্যন্ত চমৎকার একটি স্থানে অবস্থিত। কর্ণফুলী নদীর মোহনার পশ্চিম তীরে পতেঙ্গা সৈকতের অবস্থান হলেও এর ঠিক পূর্ব–দক্ষিণ তীরেই পতেঙ্গার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পারকি।
একসময় শহর থেকে আনোয়ারা হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে এখানে আসতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যেত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে পতেঙ্গা থেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল পার হয়ে এখন মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই পর্যটকরা পৌঁছে যাচ্ছেন পারকির বালুচরে। যাতায়াত ব্যবস্থার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনই মূলত সৈকতটিতে দর্শনার্থীদের ভিড় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পারকি সৈকতে যাওয়ার পথটি নিজেই একটি ছোটখাটো ভ্রমণ অভিজ্ঞতার মতো। আঁকাবাঁকা পথ ধরে যাওয়ার সময় চোখে পড়বে ছোট ছোট পাহাড় বা টিলার সারি, যা সমতলের একঘেয়েমি দূর করে দেয়। পথে যেতে যেতে দেখা মেলে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং কাফকোর মতো বিশালাকার শিল্পকারখানার দৃশ্য। সৈকতে প্রবেশের ঠিক আগে দুপাশের সরু রাস্তার ধারে সারি সারি গাছ, সবুজ প্রান্তর আর বড় বড় মাছের ঘের প্রকৃতির এক স্নিগ্ধ রূপ তুলে ধরে।
সৈকতে পা রাখতেই আপনাকে স্বাগত জানাবে ঝাউবনের শোঁ শোঁ শব্দ। কক্সবাজারের মতো এখানেও রয়েছে বিশাল ঝাউবন, যা রোদে তপ্ত দুপুরে ক্লান্ত পর্যটকদের শীতল ছায়া দেয়। ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া নীলাভ জলরাশি আর বালুচরে লাল কাঁকড়াদের অবাধ বিচরণ এক অন্যরকম মাদকতা তৈরি করে।


স্থানীয়দের কাছে এই জায়গাটি ‘পারকির চর’ নামেও পরিচিত। পর্যটকদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিতে এখানে রয়েছে স্পিড–বোট, সি–বাইক এবং ঘোড়ায় চড়ার সুব্যবস্থা। কেউ যদি একটু নিরিবিলি পছন্দ করেন, তবে সৈকত থেকে উত্তর দিকে হেঁটে গেলে যেখানে বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলী নদী মিলেমিশে একাকার হয়েছে, সেই মোহনার মোহনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
পারকি সৈকতকে ঘিরে এখন বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি কেনাকাটার জন্য দোকানপাট নির্মাণ ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে এখানে বর্তমানে উন্নত মানের হোটেল বা মোটেল না থাকায় অনেক পর্যটককে সন্ধ্যার আগেই ফিরে যেতে হয়। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স।
তবে ঈদের আনন্দে গা ভাসিয়ে দিলেও কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সমুদ্রস্নানে নামার আগে অবশ্যই জোয়ার–ভাটার সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে এবং স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। পানিতে সাঁতার কাটার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এছাড়া সৈকতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর একা বা নির্জন স্থানে অবস্থান না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই ছোটখাটো সাবধানতা অবলম্বন করলে আপনার ঈদের ছুটি পারকি সমুদ্র সৈকত হয়ে উঠবে আনন্দময় ও স্মরণীয়। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে এবং পরিবারের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে এই ঈদে আপনার গন্তব্য হোক রূপসী পারকি।

