গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যখন পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা চলছে, ঠিক সেই সময়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে খোদ বাহিনীতেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরক্তির কারণ হয়েছেন।
সোমবার পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকার প্রধানের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৮ বছরে তিনি একের পর এক পদবঞ্চনা, অপমান, বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি।
নিজের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শৈশবে মাদারীপুরের শিবচরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গেলে তিনি তাকে ধানের শীষের মালা পরিয়ে বরণ করেছিলেন। একে তিনি নিজের জীবনের বড় সৌভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে আরও কয়েকবার জিয়াউর রহমানের সংস্পর্শে আসার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
তার এই ৩ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পুলিশের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানান, মল্লিক নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তাতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) অত্যন্ত নাখোশ হয়েছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেননি বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা এই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কোনো পেশাদার কর্মকর্তা এভাবে কথা বলতে পারেন না। এ ধরনের আচরণ বজায় থাকলে একটি পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, এই বক্তব্যের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে, যা পুলিশ বাহিনীকে সাধারণ মানুষের কাছে হেয় করেছে।
রেজাউল করিম মল্লিকের সহকর্মীদের অনেকের ধারণা, আগামী ৩০ জুন অবসরে যাওয়ার কথা থাকায় চাকরির মেয়াদ বাড়ানো বা ভালো কোনো পোস্টিং পাওয়ার আশায় তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে এসব সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি মল্লিক নির্লিপ্তভাবে জানান, তিনি কেবল তার কষ্টের কথা বলেছেন। এ কথা কে কীভাবে নিল তা তার দেখার বিষয় নয়। শত্রুর অভাব নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইনি দিক থেকে এই বক্তব্য সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। তিনি উল্লেখ করেন, বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন, সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই একটি দল নিরপেক্ষ ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত হবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করা কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর এমন অবস্থানের মধ্যেই ডিআইজি মল্লিকের এই রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


