নতুন সরকার গঠনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে দলটির নেতাকর্মীরা আশায় বুক বাঁধলেও বাস্তবে তা কঠিন। আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে না দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে সরকারি দল বিএনপির নেতিবাচক কৌশলী অবস্থান এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতাদের কঠোর মনোভাব।
সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলার পর দলটির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অনেকে প্রশ্ন তুলছেন তাহলে কি আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরছে?
এমন প্রশ্নের উত্তরে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধান বলছে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর প্রশ্নে সরকারি দল বিএনপি থাকবে বেশ কৌশলী। দলটি সহসাই আওয়ামী লীগকে মাঠে ফিরতে দিতে চাইবে না, বরং এক্ষেত্রে ‘প্রচলিত আইন’সামনে আনবে দলটি, যা বিএনপি নেতাদের কথায় স্পষ্ট।
অন্যদিকে, জামায়াত ও এনসিপি কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরে আসতে দিতে চাইছে না। এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট ও কঠোর।
লেখক ও ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দন আহমদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে চায় কি না আগে দলটির নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, শীর্ষ নেতৃত্ব গুম-খুনের মামলা সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দেশের বাইরে। বিদেশে পালিয়ে থেকে নেতাদের এখনো উগ্র কথাবার্তা খোদ নেতাকর্মীরাও পছন্দ করেন না। তাহলে দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবে সেটি আগে বের করতে হবে।’
অফিস খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি হয়তো কোনো না কোনো দলের সঙ্গে আপস করে কর্মীরা কিছু জায়গায় চেষ্টা করছেন। কয়েকটি অফিস খোলা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, অনেকটাই বিভ্রান্ত নেতাকর্মীদের উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির অবস্থান
দুই দিন আগে দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আইনগতভাবে আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। তাই দলটি এই মুহূর্তে অফিস খোলা বা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। এটি আমরা চাই না। আওয়ামী লীগের বিষয়ে আইনের বাইরে আমরা কিছু ভাবছি না।’
বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতারা বলছেন, গত সাড়ে ১৫ বছরের বেশি সময় তারা আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার। সরকার পতনের আগের আচরণও তারা ভোলেননি। তাই আওয়ামী লীগকে তারা সহসাই রাজনীতিতে দেখতে চান না। তবে, আওয়ামী লীগ যেন অন্য কোন দলের দিকে ঝুঁকে না যায় সে ব্যাপারে তাদের কৌশলী ভূমিকা থাকবে। কারণ, সামনে স্থানীয় নির্বাচন রয়েছে।
বিএনপির একজন ভাইস-চেয়ারম্যান টাইমসকে বলেন, জামায়াতের তৎপরতা কমাতে আওয়ামী লীগকে মাঠে নামানো হবে এমন ধারণার এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তবতা নেই। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির কৌশল থাকতে পারে, কিন্তু এখনই কোনো স্পেস দেওয়া হবে না।
জামায়াত ও এনসিপির কড়া বার্তা
আওয়ামী লীগের অফিস খোলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঙ্গলবার প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় জামায়াতে ইসলামী। দলের মুখপাত্র ও সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে মামলা থেকে রক্ষা করতে বিএনপি নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ অফিস খুলছে।
জুবায়ের টাইমসকে বলেন, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের মুখোমুখী করা হচ্ছে। নেতাদের বিচারের পাশাপাশি দলটি এখন নিষিদ্ধ। কোনোভাবেই দলটিকে রাজনীতি করতে দেওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ ফিরতে চাইলে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহীন বলেন, ‘যেভাবে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালিয়েছে তাদের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। দেশ-বিদেশে দলটি এখন গণহত্যাকারী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যদি বিএনপি তাদেরকে ফের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দেয়, আমরা তার উপযুক্ত জবাব দেব।’
আওয়ামী লীগের নেতারা যা বলছেন
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর দলটির বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতা পলাতক রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই বাইরের দেশে অবস্থান করছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম মুঠোফোনে টাইমসকে বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে তারা প্রত্যাশা করছেন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পাবে। সেই হিসেবেই নেতাকর্মীরা অফিস খুলছেন।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভোট দিয়ে বিএনপির সঙ্গে আপসের বিষয় ভিত্তিহীন। আমরা ভোট বর্জন করেছি।’ আগের নেতৃত্ব বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্বের বাছাই করা হবে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশে আমাদের কোটি কোটি নেতাকর্মী রয়েছেন। তারাই নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারবেন।’ আওয়ামী লীগ গণহত্যা নিয়ে ক্ষমা চাইবে কি না সে ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট করেননি।
নতুন নেতৃত্বের দাবি তৃণমূলের
তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের বিপরীতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেতাদের ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। রাজধানীর বাইরে সাতক্ষীরা ও গাইবান্ধার কয়েকজন নেতা বলছেন, সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় অফিস খোলা হলেও সেটি বেশিরভাগ জায়গায় বন্ধ করা হয়েছে। অফিস খোলার সময় কর্মীদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তাই সামনের পথ তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্যে সহজ নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলা, হামলা ও ভয়ভীতির চাপে অনেক নেতা এলাকা ছাড়া। তারা নতুন নেতৃত্ব চান। অতীতে যারা দলকে ডুবিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে চান তৃণমূলের অনেকেই। এমনকি কেউ কেউ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাদ রেখে আপাতত মাঠপর্যায়ের নেতাদের নেতৃত্বে দল পুনর্গঠনের কথাও বলছেন।
আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত
আওয়ামী লীগের পলাতক একাধিক নেতা টাইমসকে বলেছেন, সময় সুযোগ বুঝে তারা অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ করে যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। দলের হাইকমান্ড সেভাবে চিন্তাভাবনা করছে। পাশাপাশি তারা সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত রাখতে চান। তবে নতুন সরকারের শুরুতেই তারা বড় কোনো রাজনৈতিক শোডাউনে যেতে চান না।
প্রত্যাবর্তনের পথ অনিশ্চিত
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এখন কেবল দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। বাস্তবতা বলছে-নিষেধাজ্ঞা, নেতৃত্ব সংকট ও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে আওয়ামী লীগের সামনের পথ এখনো দীর্ঘ ও অনিশ্চিত।


