যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী উচ্ছেদ অভিযানে গুলিতে ফের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তবে তিনি কোনো অবৈধ অভিবাসী নন বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার নাম অ্যালেক্স প্রেটি (৩৭)। শনিবার মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে তিনি মারা যান।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশে চলতি মাসে অভিবাসন অভিযান জোরদারের ফলে ফেডারেল ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের গুলিতে অন্তত পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় অন্তত ছয়জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।
মিনেসোটার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মিনিয়াপোলিসে নিহত অ্যালেক্স প্রেটি একজন নিবন্ধিত নার্স ছিলেন এবং আইনসম্মতভাবে তার আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি ছিল।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, তাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলে তিনি এজেন্টদের প্রতিরোধ করেন এবং সে সময় এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট আত্মরক্ষায় গুলি চালালে তিনি নিহত হন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা কর্মকর্তাদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিও যাচাই করে রয়টার্স জানায়, প্রেটির পরিচয় যাচাইয়ের সময় এজেন্টরা বল প্রয়োগের চেষ্টা করলে তিনি মোবাইল ফোনে এজেন্টদের ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় এজেন্টরা তাকে এবং আশপাশের অন্য বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পিপার স্প্রে করেন এবং একাধিক এজেন্ট তাকে মাটিতে চেপে ধরেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে একজন এজেন্ট অস্ত্র বের করেন এবং প্রেটিকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালান। ওই ভিডিওতে তার হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যায়নি।
একমাসের মধ্যে একের পর এক অভিবাসন বিরোধী অভিযানে একাধিক মৃত্যুর এসব ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রেটির মৃত্যুর পর তীব্র শীত উপেক্ষা করেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে মিনেসোটা। অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে এ অঙ্গরাজ্যে তিন হাজারের বেশি ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েনের ঘটনাকে কার্যত ‘অধিক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিক্ষুব্ধরা।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, অভিবাসী পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দেশ থেকে সরিয়ে দিতে এই সামরিক অভিযান প্রয়োজন। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এজেন্টদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের বিরুদ্ধেই কোনো ফৌজদারি অভিযোগ ছিল না।
তাদের অনেককে কেবল দেওয়ানি অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। আইনের চোখে এসব অপরাধ ‘ট্রাফিক আইন ভাঙার’ মতো তুলনামূলক ছোট অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে মিনেসোটাতেই জনাথন রস রেনি গুড নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করে ফেডারেল এজেন্টরা। তিনি ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কর্মকর্তা ছিলেন। তবে সে সময় নিহত গুডকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম। তিনি দাবি করেন, গুডকে আটকের চেষ্টার সময় তিনি আইসিই কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
অবশ্য গুডের মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি।
এ ছাড়া এ মাসেই অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযানে আরও অন্তত তিনটি গুলির ঘটনায় ফেডারেল এজেন্টরা জড়িত ছিলেন। গুডের মৃত্যুর পরদিনই ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট একটি গাড়ি থামানোর সময় এক ভেনেজুয়েলান পুরুষ ও নারীকে গুলি করে আহত করেন।

এরপর ১৫ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসেই আইসিই এজেন্টরা হুলিও সিজার সোসা-সেলিস নামের এক ভেনেজুয়েলান অভিবাসীকে পায়ে গুলি করেন। তখন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানায়, তিনি পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং এজেন্টদের আক্রমণ করেছিলেন। তবে পরে এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মকর্তারা আসলে ভুল একটি গাড়ির নম্বর স্ক্যান করেছিলেন এবং ভুল ব্যক্তিকে ধাওয়া করার পর এই ঘটনা ঘটে।
গুলির ঘটনাগুলোর পাশাপাশি ফেডারেল অভিবাসন হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আইসিই হেফাজতে অন্তত ছয়জন মারা গেছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্মকর্তাদের হেফাজতে অন্তত ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আইসিইর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৬৯ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অভিবাসন হেফাজতে নেওয়া হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ বা দণ্ডের কোনো তথ্য ছিল না।


