সুন্দরবনের কোলঘেঁষা গ্রামগুলো একদিকে যেমন অপার সৌন্দর্য ও সম্ভাবনার লীলাভূমি, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবনের বড় অংশই থাকে বিপর্যন্ত। ফলে নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া এই এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ চ্যালেঞ্জের।
কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসব গ্রামে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো। স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের চোখে এখন আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
মুশফিক জামান তপু সেই তরুণদেরই একজন। খুলনা অঞ্চলের মানববসতির শেষ সীমানায় কয়রা উপজেলার বেদকাশী ইউনিয়নে বাড়ি তার।
কয়রার বেদকাশী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে রাজধানীর নামকরা নটরডেম কলেজে ভর্তি হয়েছে তপু। এই সাফল্যের জন্য তার বাবা-মা থেকে শুরু করে স্কুল-শিক্ষকরা পর্যন্ত কৃতিত্ব দিচ্ছেন অনলাইন শিখন পদ্ধতির প্ল্যাটফর্মকে।
যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও শিক্ষার অত্যাধুনিক সুবিধাগুলো লুফে নিতে পারছে শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘শিখো লার্নার্স রিপোর্ট ২০২৫’ এর বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরে এই অনলাইন অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ দেশের গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী। ২০২১ সালে থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এখানে টিচিং নেওয়া মোট ৩৪ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২২ লাখ ২৪ হাজারের অবস্থানই গ্রামাঞ্চলের।
এমনকি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১১ লাখ শিক্ষার্থী ২০২৫ সালে এই প্ল্যাটফর্মে টিউটর নিয়েছেন। এছাড়াও ২০২৪ সালের ৮ লাখ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো এখান থেকে টিচিং নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামরি শিক্ষার্থী নিবিড় কর্মকার জানান, স্বল্প খরচে ভালো শিক্ষকের কাছে টিচিং পাওয়ার জন্যই গ্রাম পর্যায়ের এতো শিক্ষার্থী এই অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। এছাড়াও একবার রেজিস্ট্রেশন করলে সারা বছর লাইভ ক্লাস, অনলাইন লাইব্রেরিতে ক্লাসের রেকর্ডগুলো যেকোনো সময় দেখার সুবিধা, কুইজ প্রতিযোগিতা, মডেল টেস্ট, পরীক্ষা, অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও গণিতের সহজ সমাধান পাওয়া যায়।
খরচের বিষয়ে শিখো ডটকম কর্তৃপক্ষ জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বিষয় প্রতি মাসে গড়ে ১০০ টাকা খরচ হয়। উচ্চ মাধ্যমিকে এই খরচ ১২০ পর্যন্ত হচ্ছে। সেই হিসেবে বছরে মাত্র ১০ হাজার টাকা খরচে একটা ক্লাসের ফুল কোর্সের টিচিং নেওয়া এবং অনুশীলনের সুবিধা পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয়ভাবে প্রাইভেট পড়ার তুলনায় এই খরচ অনেক কম। ২০২৫ সালে এই প্ল্যাটফর্মে অধ্যয়নকারী ৫ হাজার ৪০০’র বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেয়েছে।
শিখো ডটকমের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনলাইনে আইসিটি এবং গণিত বিষয় দুটির টিচিং নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। তাদের প্ল্যাটফর্মের ৩৪ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী পাঠ বোঝার জন্য ক্লাসের পর এআই এর সহায়তা নিয়েছেন। গত ৩৮৬ দিনে অনলাইনে ৫৬৬ মিলিয়ন মিনিট পাঠ দেওয়া হয়েছে শিখোডটকম থেকে, ২০২৩ সালের তুলনায় যা দ্বিগুণ।
এর মধ্যে মেয়েরা পাঠ নিয়েছে ৩৩৩ মিলিয়ন মিনিট এবং ছেলেরা পাঠ নিয়েছে ২৩৩ মিলিয়ন মিনিট।
এ বিষয়ে শিখো ডটকমের প্রধান নির্বাহী শাহীর চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্থানীয় শিক্ষকদের তুলনায় আমাদের শিক্ষকরা অনেক আপডেটেড। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টপাররা এখানে পড়ান। সেই তুলনায় খরচ খুব কম। এছাড়াও এআই টুলসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কারিকুলামের অন্তভূক্ত বিষয়গুলো প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও শেখার ব্যবস্থা আছে।’
একই সঙ্গে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ডিজিটাল ডিভাইস কেনার সাধ্যের বিষয়টিকে দেশজুড়ে অনলাইন শিক্ষার সম্প্রসারণের পথে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রতি বছর অনলাইন শিক্ষার শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।


