‘আমার বয়স ৭০ বছর। এত পানি জীবনে দেখিনি। চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পাঁচ মিনিটের জন্যও যদি বিদ্যুৎ আসত, অনেক মানুষের উপকার হতো…।’ বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে না পেরে এভাবেই হাহাকার করছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম গুনাগরির প্রবীণ ফার্মেসি ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর।
তার মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন গোটা বাঁশখালীবাসী। টানা বৃষ্টি আর আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে বসতঘর, পথঘাট। চারদিকে শুধু বন্যার পানি আর মানুষের বাঁচার লড়াই।
সরেজমিনে পশ্চিম গুনাগরি, কালিপুর ও বাহারছড়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় চিত্র। কোথাও কোমর, কোথাও বুকসমান পানি। অনেক পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে, কেউবা বুকসমান পানির মধ্যেই আঁকড়ে ধরে আছে নিজের শেষ সম্বলটুকু।
গুনাগলি এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৩০০টি বাড়ি এখন পানির নিচে। এই বিপর্যয়েও ঘরহীন বিপন্ন মানুষগুলোর জন্য শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা লাবুর দোকানের দোতলা ভবনটি। সাধারণ সময়ে আড্ডার জায়গা হলেও এই দোকানই এখন কয়েকশ মানুষের অস্থায়ী ঘর।
সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ে গাদাগাদি করে থাকা পরিবারগুলোর কষ্ট। কেউ মেঝেতে চাদর বিছিয়ে বসে আছেন, কেউবা কোলের শিশুকে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে আছেন বাইরের থইথই পানির দিকে।
সেখানেই কথা হয় কালিপুর ইউনিয়নের আহমেদ হোসেনের (৬৫) সঙ্গে। ঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে এখন তিনি এই দোকানের বাসিন্দা। ক্লান্ত চোখে তিনি বলেন, ‘জীবনে অনেক বন্যা দেখেছি। কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি।’ আসবাব থেকে শুরু করে গোলার ধান, সবই এখন পানির নিচে।
হরদণ্ডী ইউনিয়নের ফারাছা বেগমও সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু প্রাণটুকু হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি, সঙ্গে আনতে পারেননি কোনো কাপড়চোপড়।

লাবুর দোকানের সামনে একটি বসার জায়গায় বসে আছেন সাদিয়া সোলতানা। তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে, কিন্তু চারদিকে থইথই পানি। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সাদিয়ার এই অনিশ্চয়তা যেন পুরো আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, কিরণ বালা জলদাসের বউমার কোলে মাত্র ২০ দিনের এক নবজাতক। আট সদস্যের পরিবার নিয়ে এই গাদাগাদি পরিবেশে শিশুটির সুরক্ষা নিয়ে চরম উদ্বেগে আছেন তিনি। পরিষ্কার কাপড় কিংবা নিরাপদ পরিবেশ- কোনোটিরই বালাই নেই এখানে। ছয় মাস বয়সী সন্তানকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে বসে থাকা পম্পি দাশ বলছিলেন, ‘বাচ্চাটার কষ্ট বেশি হচ্ছে। রাতে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সকালে দূরের হাসপাতালে পাঠিয়েছি।’
বন্যাদুর্গত এই এলাকাগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের। বিশেষ করে শিশুদের জন্য দুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব প্রতিটি মুহূর্তকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রাতের অন্ধকার নামলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়ে।
এদিকে শুক্রবার সকালে বিরোধীদলের নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দুর্গতদের অবস্থা দেখতে বাঁশখালীতে যান এবং মানুষের দুর্দশার কথা শোনেন।
বাইরে বৃষ্টি থামলেও পানি নামার কোনো লক্ষণ নেই। ঘরের টিনের চালের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন অসহায় মানুষগুলো। তাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন- কবে নামবে পানি? কবে ফিরতে পারবেন নিজ নীড়ে? তবে আকাশের মেঘলা আকাশ সেই অপেক্ষাকে যেন আরও দীর্ঘতর করার আভাস দিচ্ছে।


