অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ায় দেশে গুরুতর দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা সক্ষমতার বড় ঘাটতি ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এতে তৈরি হচ্ছে গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট।
প্রতি বছরই হাজারো দগ্ধ ব্যক্তি সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন। দগ্ধ রোগীর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেকের জীবন বাঁচানো যায় না।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই সংকটের ভয়াবহতা চোখে পড়ে শুক্রবার সকালে। যখন ঢাকার উত্তরায় একটি আবাসিক ভবনের অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা পোড়া রোগীর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঝুঁকির বিষয়টি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ২৩ হাজার ৪৩২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৬৪টি। যদিও আগের বছরের তুলনায় সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবু পরিস্থিতি উদ্বেগজনকই রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্নিকাণ্ডে অনেক মৃত্যুর কারণ হলো দগ্ধ হওয়ার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অর্থাৎ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বিশেষায়িত চিকিৎসা না পাওয়া। এই সময়টাই রোগীকে বাঁচানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট দগ্ধ রোগীদের জন্য দেশের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র। এখানে প্রায় ৫০০টি শয্যা রয়েছে, যার মধ্যে ২২টি আইসিইউ এবং ২২টি হাই-ডিপেনডেন্সি ইউনিটের শয্যা। বিশ্বের অন্যতম বড় বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রায়ই ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় কাজ করে।
এর ফলে গুরুতর দগ্ধ রোগীদের ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এসব হাসপাতালের অনেকেরই জটিল পোড়া রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত অবকাঠামো নেই।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হুসাইন বলেন, দগ্ধ হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বার্ন ইউনিটের তীব্র সংকট এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যথাযথ চিকিৎসা সুবিধার অভাবে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পান না।
পোড়া রোগীর চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সরকার সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুরের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার বার্ন ইউনিট স্থাপনের একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। শুরুতে ৪৫৬ দশমিক শূন্য ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ বাড়ানো, নকশা পরিবর্তন ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৬ দশমিক ১৯ কোটি টাকা। নতুন করে প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুরুতর দগ্ধ রোগী এখানে আসেন। দুর্ভাগ্য, অনেক দুর্ঘটনায় রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ায় সেগুলো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
মুশতাক হুসাইন অবশ্য পোড়া রোগীর চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিক করে ফেলাকে একটি ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ একটি দেশে রোগীদের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নষ্ট হওয়া ঠেকাতে জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গেই সংযুক্ত আঞ্চলিক বার্ন ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি স্তরভিত্তিক বা পিরামিড আকৃতির পোড়া রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থার কথাও বলেন, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা, মাধ্যমিক পর্যায়ে কম জটিল রোগীদের চিকিৎসা এবং তৃতীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও ক্লিনিক্যাল দিকনির্দেশনা থাকবে।
মুশতাক হুসাইন বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে সক্ষমতা কম থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা হলে হাসপাতালগুলোতে চাপ পড়ে। একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে রোগীদের দূরের হাসপাতালে পাঠানোর আগেই জীবন বাঁচানো, বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমানো এবং দগ্ধ রোগীদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যেত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।


